27/01/2026
খলিফার লুকিয়ে বিয়ে
বর্তমান জামানায় ছেলে-মেয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে আবার তালাকও হয়ে যায়। কারো বাপ-মা জানতেই পারে না যে, তাদের ছেলে বা মেয়ে ইতিমধ্যে বিবাহিত বা বিবাহিতা হয়ে গেছে।
মুসলিম ইতিহাসের একজন খলিফাও এভাবে লুকিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তার নাম আবু জাফর মানসুর—যাকে আব্বাসি খেলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।
খেলাফতের মসনদে বসার বহু আগে তরুণ বয়সে আবু জাফর মানসুর কিছুদিন মসুল শহরে (জীবিকার তাগিদে) নৌকা চালিয়েছেন। এ সময় তিনি বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি স্ত্রীকে গল্প শোনাতেন। তাকে বলতেন, 'জানো, আমি এমন এক পরিবারের সন্তান—যারা শীঘ্রই এ দেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন হবে।'
কিছুদিন পর স্ত্রী গর্ভবতী হলো। তিনি সংবাদ পান যে, উমাইয়ারা তাকে খুঁজছে। বাধ্য হয়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। পালানোর আগে স্ত্রীকে বললেন, 'যদি আমাদের কোনো পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তাহলে তার নাম রাখবে জাফর। আমি নিরাপদ হলেই তোমাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসব।' এরপর তিনি একটি কাগজে তার বংশধারা লিখে যান।
কিছুদিন পর তার একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। আবু জাফরের আদেশমতে স্ত্রী ছেলের নাম রাখেন জাফর। এই সন্তানের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। সে বিভিন্ন শাস্ত্রে দক্ষ হয়ে ওঠে। ততদিনে উমাইয়াদের পতন ঘটেছে। কিছুদিন পর আবু জাফর ক্ষমতায় বসেন। তার তরুণ সন্তান জাফর তখন বাগদাদ গমন করে রাজদরবারে কেরাণীর চাকরি নেয়। রাজদরবারের হিসাবরক্ষক আবু আইয়ুব মুরিয়ানী এই তরুণকে অনেক পছন্দ করেন।
একদিন তিনি সেই তরুণকে এক কাজে খলিফার দরবারে পাঠালেন। তরুণকে দেখে খলিফা খানিকটা চিন্তিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম কী?
'জাফর।'
তোমার পিতা কে?
তরুণ চুপ। খলিফা পুনরায় জিজ্ঞেস করার পর সে জানায় সে স্বয়ং খলিফার পুত্র। খলিফা তখন তাকে তার মায়ের সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মসুল শহর সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেন। তরুণটি ঠিক ঠিক জবাব দেয়। তখন খলিফা আবেগাপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন,
'তুমি আমার পুত্র। তুমি আমার পুত্র।'
খলিফা তাকে একটি হার, প্রচুর সম্পদ ও একটি পত্র দিয়ে বললেন, 'যাও তোমার মাকে নিয়ে এসো।'
যুবক ফিরে এলে আবু আইয়ুব জিজ্ঞেস করেন,
'তুমি খলিফার দরবারে এতক্ষণ কী করছিলে?'
যুবক বলল, 'খলিফা আমাকে দিয়ে কিছু পত্র লেখাচ্ছিলেন।' আবু আইয়ুবের সাথে কথা শেষ করে সেদিনই যুবক মসুলের উদ্দেশে রওনা দেন। তার এই হঠাৎ সফর আবু আইয়ুবের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। সে ভাবতে থাকে, সম্ভবত এই যুবক খলিফার কাছে তার বিরুদ্ধে কোনো নালিশ বা গোপন তথ্য ফাঁস করেছে। সে তখনই একজনকে পাঠালো এই যুবককে হত্যা করতে। সে ঘাতক কয়েক মনজিল সফর করেই যুবকের দেখা পেয়ে যায়। তাকে হত্যা করে একটি কূঁপে ফেলে দেয়।
এদিকে খলিফা তার সন্তান ও পরিবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন; কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেলেও তার পরিবার ও সন্তান ফিরে এলো না। তখন খলিফা বিষয়টি তদন্ত করার আদেশ দেন। তদন্ত শেষে আবু আইয়ুবকে হত্যা করা হয় এবং তার সমস্ত সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর খলিফা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনি এক গোপন বেদনায় ভুগেছেন। যখনই তার এই ছেলের কথা মনে পড়ত, তিনি বিমর্ষ হয়ে যেতেন।