18/06/2026
ম্যানগ্রোভের লোনা বাতাস আর খলিশা ফুলের তীব্র মিষ্টি সুবাস চারদিকে। সুন্দরবনের বুক চিরে বয়ে চলা সরু খালের পাড়ে নৌকা বেঁধেছে তিন মৌয়াল—রহমত চাচা, তার তরুণ ভাগ্নে কাসেম আর বিশ্বস্ত সঙ্গী তাহের ।
আজ পহেলা এপ্রিল, মধু কাটার মৌসুমের প্রথম দিন। বুকভরা আশা আর একরাশ আতঙ্ক নিয়ে তারা পা রেখেছে বনের গহীন অন্ধকারে। সুন্দরবনে পা রাখা মানেই প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, যেখানে একপাশে ক্ষুধার্ত বাঘ আর অন্যপাশে বিষাক্ত সাপের বাস।
রহমত চাচা অভিজ্ঞ মৌয়াল। বনের প্রতিটি গাছের ভাষা যেন তার চেনা। কাসেমের পিঠে ঝুলছে মধু সংগ্রহের বড় ড্রাম, আর তাহেরের হাতে ‘কাড়ু’ বা ‘ঝাঁকড়’—হেঁতাল পাতা দিয়ে তৈরি ধোঁয়ার মশাল।
কিছুটা পথ এগোতেই রহমত চাচা থমকে দাঁড়াল। উপরে আঙুল উঁচিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ঐ দেখ্, কাসেম।"
একটি বিশাল খলিশা গাছের উচুঁ ডালে ঝুলে আছে এক বিশাল চাক। হাজার হাজার মৌমাছি কালো মেঘের মতো ঘিরে রেখেছে সেটাকে। চাকের নিচের অংশটা ভারি হয়ে আছে ঘন, সোনালি মধুতে। সকালের মিষ্টি রোদ গাছের পাতার ফাঁক গলে সেই মধুর ওপর পড়তেই তা সোনার মতো চকচক করে উঠল।
কাজ শুরু হলো দ্রুত। তাহের কাড়ুর মশাল জ্বেলে ধোঁয়া দিতেই মৌমাছিরা শান্ত হয়ে চাক ছাড়তে শুরু করল। কাসেম নিচে ড্রামটি সোজা করে ধরল, যেন এক ফোঁটা মধুও মাটিতে না পড়ে। রহমত চাচা মুহূর্তের মধ্যে গাছে চড়ে বসলেন। তার কোমরে বাঁধা কাস্তে।
ধোঁয়ার কুয়াশার মাঝে, হাজারো মৌমাছির গুঞ্জনের শব্দে চারপাশ মুখরিত। রহমত চাচা নিখুঁত দক্ষতায় চাকের ঠিক মধু জমে থাকা অংশটুকু কাটলেন। বাকি অংশটা রেখে দিলেন, যাতে মৌমাছিরা আবার সেখানে বাসা বাঁধতে পারে। চাক থেকে কেটে নেওয়া বড় অংশটি যখন তিনি নিচে নামিয়ে দিলেন, কাসেম দুই হাতে তা সাবধানে ড্রামে পুরে নিল। চিপে বের করা তাজা মধুর ধারা যখন ড্রামে পড়তে লাগল, তখন খলিশা ফুলের সেই বিশেষ সুবাসে পুরো বাতাস ম ম করে উঠল। খাঁটি, তরল সোনা!
ঠিক তখনই বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূরে একটা হরিণ ডেকে উঠল। রহমত চাচার অভিজ্ঞ কান সতর্ক হয়ে গেল। হরিণের ডাক মানেই আশেপাশে কোথাও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি!
"তাড়াতাড়ি কর কাসেম, সময় নেই!" রহমত চাচা গাছ থেকে নেমে এলেন দ্রুত। কাসেম ড্রামের মুখ শক্ত করে আটকে পিঠে তুলে নিল। তাহের ধোঁয়ার মশালটা জ্বালিয়ে রেখে চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখল। তারা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত নৌকার দিকে পা বাড়াল। বুক দুরুদুরু কাঁপছে, পায়ের নিচে কাদা আর শ্বাসমূলের খোঁচা, কিন্তু পিঠের ড্রামভর্তি মধুর ভার তাদের মনে এক অদ্ভুত সাহস জোগাচ্ছিল।
নৌকায় ফিরে যখন তারা মাঝনদীতে চলে এল, তখন সবার বুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কাসেম ড্রামের মুখটা সামান্য খুলে খাঁটি মধুর সুবাস নিল। এই মধুর উপার্জনেই চলবে কাসেমের ছোট বোনের বিয়ের খরচ, রহমত চাচার সংসারের কয়েক মাসের চাল-ডাল।
সুন্দরবন প্রতি বছর যেমন প্রাণ কেড়ে নেয়, তেমনি অকৃপণ হাতে তার সন্তানদের মুখে অন্নও তুলে দেয়। চারদিকের খলিশা বনের দিকে তাকিয়ে রহমত চাচা মৃদু হেসে বললেন, "আল্লাহ আজ খালি হাতে ফেরায় নাই রে কাসেম। এই আল্লহর দান, মাথায় তুলে রাখ।"
নৌকা এগিয়ে চলল লোকালয়ের দিকে, আর পেছনে রয়ে গেল রহস্যময়, সুন্দর ও ভয়ঙ্কর সুন্দরবন।
#বিসমিল্লাহ_শপ