01/12/2025
১৯৭১ এর অক্টোবরের এক বিকেল। আকাশে তখন শীতের কুয়াশার প্রথম ইঙ্গিত। খালের ওপারে ভেড়ামারি গ্রাম। নীরব, অথচ ভিতরে ভিতরে দপদপ করছে আতঙ্কের আগুন। কারণ ওখানেই বসেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। স্টেনগান হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা দেখল এক অদ্ভুত কিশোরী খালি পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। সারা গায়ে গোবর আর কাদা মাখা। চুলে পাখির বাসার মতো জট, পরনে ছেঁড়া কাপড়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ভবঘুরে পাগল, আচরণেও যেন পথ হারানো কোনো এক পাগলী।
মেয়েটি ক্যাম্পের পাশে এসে দাঁড়াল। সৈন্যদের গালাগাল করলো, চিৎকার করে হাসলো। আবার গাল দিলো। পাক হানাদার সেনারা প্রথমে ভয় পেলেও পরক্ষণেই মেয়েটির আচরণে তারা মজা পেতে শুরু করল। মেয়েটি পাশ থেকে কখনো গোবর কুড়ালো, কখনো ক্যাম্পের দিকে ছুড়ে মারল আবার কখনো ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরে ঘুরে বকবক করল। তারপর ভাবলেশহীন ভাবে চলে গেল।
ক্যাম্পের হানাদার সৈন্যরা তখনও বুঝে উঠতে পারলো না ঘটনা ততক্ষণে ঘটে গেছে। যেই মেয়েটি তাদের সামনে পাগল সেজে অভিনয় করে গেল, সে আদতে পাগল না। মেয়েটি সেদিন ক্যাম্পের অস্ত্র, সৈন্যসংখ্যা আর চলাফেরার প্রতিটি পথ মুখস্থ করে গেছে। তারা জানেও না, চোখের সামনে দিয়ে এক কিশোরী তাদের মৃত্যু-পরোয়ানার চিত্রনাট্য লিখে গেছে।
সেদিন রাতেই থালিয়াভাঙ্গায় লুকিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিখুঁত এবং পরিকল্পিত আক্রমণ চালাল ক্যাম্পে। ক্যাম্প উড়ে গেল। ক্যাম্পের পাশে পতপত করে উড়ল পতাকা।
অসীম সাহসী এই নারীর নাম বীরপ্রতীক তারামন বিবি। প্রকৃত নাম তারামন বেগম। জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে। বাবা আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বেওয়া।
এক সন্ধ্যার কথা। তারামন বিবি কচুরমুখি তুলছেন। পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ক্যাম্পের তত্বাবধানে থাকা মুহিব হাবিলদার সেদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন। তিনি তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চাইলেন রান্নার কাজে। তারামন বিবির মা প্রথমে রাজি হলেন না। তারপর মুহিব হাবিলদার তাকে ধর্মকন্যা হিসেবে গ্রহণ করলে তার মা রাজি হোন এবং তারামন বিবি জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।
ক্যাম্পে তারামন বিবি রান্নার পাশাপাশি অস্ত্র পরিষ্কার করতেন। ফাঁকে ফাঁকে মুহিব হাবিলদার শেখাতেন কীভাবে নিশানা ধরতে হয়, কীভাবে স্টেনগান চালাতে হয়।
একদিন দুপুরে সবাই যখন খেতে বসেছে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো চারপাশে নজর রাখতে। ঐসময় তারামন বিবি সুপারি গাছে উঠে দূরবীন দিয়ে চারিদিকে লক্ষ্য রাখছিলেন৷ হঠাৎ দেখলেন, পাক বাহিনীর একটি গানবোট নদীপথ ধরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ ভরা পাকসেনা। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জানালেন। শুরু হলো তুমুল প্রতিরোধের প্রস্তুতি। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ। তারামন বিবি সরাসরি অংশ নিলেন যুদ্ধে। অসীম সাহসীকতার পিছু হাঁটল পাক সৈনরা।
যুদ্ধের বাকিটা সময় কখনো লড়েছেন সম্মুখভাগে, কখনো করেছেন রেকির কাজ। তারামন বিবির জীবন ছিলো আগুনের সঙ্গে খেলা। কিন্তু তাঁর মুখে, তাঁর চোখের ভেতর ছিলো অন্য কিছু। এক ধরনের মাতৃত্ব, এক ধরনের স্থিরতা। যেভাবে মা সন্তানকে ধারণ করে, তিনি সেইভাবে ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশকে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
তারামন বিবি দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি অসীম সাহসী মহীয়সী বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে।
(এডমিন)