04/09/2026
ভেবেছিলাম, কিছু লিখবো না,
কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষিত অশিক্ষিত এমনকি সরকারি চাকরির 'স' বুঝেনা, সরকারি চাকরি পাওয়ার কোন যোগ্যতা নেই এমন যদু মধুও যখন পে-স্কেল নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তখন কলম হাতে না নিয়ে পারলাম না।
সরকারি পে- স্কেল ঘোষনার দু-বছর আগে থেকেই বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার প্রচারণা করা হয়, সবশেষে আমাদের কেবিনেট সচিব মহোদয় প্রেস কনফারেন্স ডেকে ঘোষণা দিয়ে থাকেন, ফলে আমরা পুরো দেশবাসী তা জানতে পারি। কেউ একজন কি বলতে পারবেন,- কোন প্রাইভেট কোম্পানির কোন কর্মকর্তার বেতন কোন সময় বাড়নো হয় বা কতটুকু বাড়ানো হয়।
পারবেন? জানি কেউ পারবেন না। শুধু ঐ কর্মকর্তা আর মালিকপক্ষ ই জানেন।
যারা পে-স্কেলের বিরোধিতা করছেন তারা কি সবাই জানেন যে, ২০১৫ সালের পর গত এগারো বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের কোন বেতন বাড়েনি। কিন্তু মূল্য স্ফিতি হয়েছে পাঁচ গুণ, ২০১৫ সালে যে সবজি আমরা বিশ টাকায় সেই সবজির মূল্য এখন একশত টাকা, অন্যান্য দ্রব্য মূল্যের প্রসংগ তুলে সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না।
আমার বাসার পাশেই এক বেসরকারি স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে, জানতে পারলাম সেই স্কুলের অধ্যক্ষ সাহেবার মাসিক বেতন মাসিক সাড়ে তিন লাখ টাকা।
যেখানে একজন গার্মেন্টসের জিএম, পিএম এর বেতন মাসে তিন লাখ/পাঁচ লাখ টাকা সেখানে প্রশাসনের সর্বোচ্চ আসনে অধীন একজন সচিবের বেতন কত কেউ কি জানেন? মাত্র আটাত্তর হাজার টাক।
প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে কিন্তু সচিব পর্যন্ত আসতে।
আমরা পরিচিত একজন একটি গ্রুপ অফ কোম্পানির একাউন্টস অফিসার তার বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাটের কোন অভাব নেই, আমি নিজে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ অফিসের একজন একাউন্টস অফিসার আমার নূন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।
সরকারি চাকুরিজীবীরা সব ঘুষখোর। তাই এদের বেতন বাড়ানো যাবে না। দেশের বাকি সবাই সাধু, তাই এদেরকে মাথায় তুলে রাখতে হবে।
ভালো।
ঘুষ কি শুধু একপেশে জিনিস? কেউ টাকা দিয়ে অন্যায় সুবিধা পেতে চাচ্ছে বলেই তো ঘুষের উৎপত্তি হচ্ছে।
দিনশেষে এখানে কেউই সাধু না। সরকারি চাকুরিজীবীদের মাঝে যেমন অসৎ লোক থাকে, সেরকম সেবাগ্রহীতাদের মাঝেও ধান্দাবাজ, অসৎ লোক আছে যারা তাদের সার্ভিসটি দ্রুত পাবার জন্য বা অন্যকে ডিঙ্গিয়ে পাবার জন্য এই ঘুষ দিয়ে থাকেন।
আবার যারা নিজেদের সৎ দাবি করেন তাদের মাঝেও বেশিরভাগ সুযোগের অভাবে সৎ আছেন।
যেমন :
> বৃষ্টি হলেই রিক্সার ভাড়া ডাবল হাঁকা লোকটা সরকারি চাকুরে না।
> বর্ষা আসলেই মরিচের কেজি বারোশো টাকা হাঁকানো লোকটা সরকারি চাকুরে না।
> বাজারে ওজনে কম দেওয়া লোকটা সরকারি চাকুরে না।
> চাঁদা না পেয়ে মহিষের খাবারে বিষ মিশিয়ে মহিষ মেরে ফেলা লোকগুলো সরকারি চাকুরে না।
> হলুদ গুড়ার রং উজ্জ্বল করতে তাতে সীসা মেশানো কিংবা মরিচের গুড়ায় ইটের গুড়া মেশানো কিংবা পোড়া বাসি ময়লা তেলে খাবার তৈরি করা লোকগুলো সরকারি চাকুরিজীবী নন।
> পারিবারিক/জমি সংক্রান্ত ঠুনকো বিষয়ে অকাতরে নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া সব মামলাবাজ লোক সরকারি চাকুরিজীবী নন।
> শত্রুতা করে কারো পুকুর ভর্তি মাছ বিষ দিয়ে মেরে ফেলা কিংবা ফল বাগানের গাছ কুপিয়ে কেটে ফেলা লোকগুলো সরকারি চাকুরিজীবী নন।
> সম্পত্তির ভবিষ্যতের মালিক দাবীদার হতে পারে এমন এক ছয়মাস বয়সী শিশুর পা ভেঙে দেয়া চাচী কিংবা শিশু অপহরণ করে তাদেরকে শারীরিকভাবে আঘাত করে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষা ব্যবসা করানো লোকগুলোও সরকারি পদে নাই।
> বাজেট উপস্থাপনের সময় কোনো কোনো পণ্যে শুল্ক বাড়তে পারে শুনেই আগে থেকে আমদানিকৃত মজুদ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া কিংবা বাজেটে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব সহ বাজেট অনুমোদিত হবার পরেও আগের শুল্কে আমদানি করা মাল বলে সেই বেশি দামেই পণ্য বিক্রি করা লোকগুলো কি সরকারি চাকুরী করেন?
বেসরকারি সেক্টরের কোন পদের বেতন সর্বোচ্চ কত হওয়া উচিত এটা নিয়ে কেউ কথা বলেন? শ্রমঘন শিল্পের সর্বনিম্ন বেতন তো সরকারই ঠিক করে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্যাংক লোন নেয়ার সময়, বেসরকারি কোনো অফিসে মালামাল সরবরাহ করে বিল নেয়ার সময় কি ঘুষ দিতে হয় না?
বেঞ্জামিন ডিসরেইলি বলেছিলেন "মানুষ যেখানে ভালো, আইন সেখানে অপ্রয়োজনীয়। মানুষ যেখানে খারাপ, আইন সেখানে অকার্যকর"।
সমাজে সব সেক্টরেই কমবেশি বদলোক থাকে কিন্তু সেটার উপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে কিছু বলা অমূলক।
সরকারি চাকুরেরা ঘুষ তো খায়ই, এদের বেতন বাড়ানোর কী দরকার-এই লজিক দেওয়ার মানে হলো আমাদের মতো যারা ঘুষ না খেয়ে নিজের কাজটা নিজের আমানত মনে করে করছে তাদেরকে ঘুষের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া। আপনি তো ভাই এ কথা দিয়ে ঘুষকে জাস্টিফাই করছেন। যে আপনার কাছ থেকে ঘুষ চাচ্ছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।
আর সরকারি সকল সেক্টরে যে ঘুষ চলে সেটাও কিন্তু ঠিক নয়।
আমাদের চারপাশে তাইই আমরা দেখি যা আসলে আমরা নিজেরাই। আমাদের লোভ, আমাদের নির্বুদ্ধিতা, আমাদের দায়িত্বহীনতা, আমাদের অপরিণামদর্শীতা, আমাদের মনের নীচতা, শর্টকাটে বড়লোক (পড়ুন ধনী) হতে চাওয়া, নিজের সামান্য সুবিধার বিনিময়ে চরম অসৎ ও দুষ্ট লোককে ভোট দেয়ার অভ্যাস, আমার সুবিধাই সবার আগে, দেশের ক্ষতি হলে হোক আমার কী যায় আসে মনোভাব - এসবই আমাদের মাঝে প্রকট।
সরকারি চাকুরি করেও জীবনে অর্থসম্পদ অর্জন করতে পারেনি সুতরাং লোকটা একটা বলদ - এই মনোভাব কি সমাজ থেকে তিরোহিত হয়েছে?
পাত্র সরকারি চাকুরি করে, ঘুষ নিয়ে ধনী হতে পারবে বলে তার হাতে নিশ্চিন্তে মেয়েকে তুলে দেয়া যায় - এমন মনোভাব কি বাংলাদেশের কোনো পিতামাতাই ধারণ করেন না?
বিশাল রেস্টুরেন্ট কিংবা রিসোর্ট আছে, ন্যুনতম লাভজনকভাবে চলতে যত কাস্টমার দরকার, তা মোটেই নেই। তবুও এগুলো কি চলছে না, অর্থাৎ ব্ল্যাক মানি হোয়াইটেনিং এ ব্যবহৃত হচ্ছে না?
আবার অত্যন্ত চালু ও ব্যস্ত রেস্টুরেন্ট কি ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য অনলি ক্যাশ পেমেন্ট সিস্টেমে চলে বলে ক্যাশ কাউন্টারে নোটিস ঝোলায়নি?
ট্যাক্সের প্রসংগ যখন আসলো তখন বলি, অনেকেই কথায় কথায় বলেন "আমাদের ট্যাক্সের টাকায় এদের বেতন চলে" এখানেও কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীরা এগিয়ে কারণ যতরকম চাকরিজীবী আছেন তাদের মাঝে সরকারি চাকরিজীবীরা কিন্তু সরকারকে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স প্রদান করে থাকেন। বেতনের টাকা আমার একাউন্টে ঢোকার আগেই কিন্তু সরকার ট্যাক্সের টাকা কেটে রাখেন। আমার অনেক বন্ধু বান্ধব আছেন যারা মাসে আমার চেয়ে বেশি আয় করতে কিন্তু ট্যাক্স কি সেটাই তারা জানেন না।
তাই আসুন, যে দুর্নীতি করছে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করুন, আইনের আওতায় আনুন। তাকে ডেকে মসজিদের কমিটিতে কে জায়গা দেয় ভাই? সরকার? নাকি তার এলাকার লোকেরা?