24/10/2026
ত্রিশাল-ভালুকায় পাঙ্গাসের মড়ক রোধে সাইফি নাসিরের গবেষণায় আশার আলো
---------------------------------------------------------------------------
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাষযোগ্য মাছ পাঙ্গাস। স্বল্প সময়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন, তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্য এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে মাছটির গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং মাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে পাঙ্গাস চাষে মাঝেমধ্যে দেখা দেয় আকস্মিক মৃত্যুহার। বিশেষ করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ভালুকা অঞ্চলে ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে পাঙ্গাসের ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা খামারিদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে পাঙ্গাসের বৃদ্ধি, শারীরিক সূচক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পোস্টবায়োটিকের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অ্যাকুয়াকালচার নিউট্রিশনিস্ট ও গবেষক সাইফি নাসির।
সাইফি নাসিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় বেশ কয়েকটি পাঙ্গাস চাষ প্রকল্প নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আওতায় আনেন। এসব প্রকল্পে মাছের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, চাষের পরিবেশ এবং মৃত্যুহারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মাছের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কাজ করেন তিনি। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে এসে গবেষণার আওতাভুক্ত খামারগুলোতে পাঙ্গাসের মৃত্যুহার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেন এই গবেষক।
তার গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পোস্টবায়োটিকের ব্যবহার। এ ক্ষেত্রে তিনি Kluyveromyces marxianus নামের একটি ইস্ট প্রজাতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি পোস্টবায়োটিক সম্পূরক নিয়ে কাজ করেছেন। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাসের বৃদ্ধি, শারীরিক বা বায়োমেট্রিক সূচক এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মাত্রায় পোস্টবায়োটিক সম্পূরক ব্যবহারের প্রভাব মূল্যায়ন করা।
গবেষণাটির ইংরেজি শিরোনাম ‘Assessing Growth Performance, Biometric Indices and Health of the Thai Pangus (Pangasianodon hypophthalmus) Rearing under Different Dietary Dose of Postbiotics (Kluyveromyces marxianus) Supplementation in Commercial Ponds’। এতে থাই পাঙ্গাসের খাদ্যে বিভিন্ন মাত্রায় পোস্টবায়োটিক সম্পূরক ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের বৃদ্ধি, শারীরিক সূচক ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার পরিবর্তন মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাইফি নাসির জানান, গবেষণার আওতায় থাকা খামারিরা আগের দুই বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে পাঙ্গাসের মৃত্যুহার কমার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। তার মতে, এই পর্যবেক্ষণ পাঙ্গাস চাষে উন্নত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কৌশল নিয়ে আরও গবেষণার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে গবেষণায় ব্যবহৃত পোস্টবায়োটিকের সুনির্দিষ্ট মাত্রা, পরীক্ষামূলক ও নিয়ন্ত্রণ দলের ফলাফল, নমুনার সংখ্যা এবং মৃত্যুহার কমার শতকরা পরিমাণ প্রকাশ করা হলে এর কার্যকারিতা আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
পাঙ্গাস চাষে কেন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টবায়োটিক?
মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় পোস্টবায়োটিক নিয়ে গবেষণা বিশ্বজুড়েই আগ্রহের বিষয়। পোস্টবায়োটিক বলতে উপকারী অণুজীবের নিষ্ক্রিয় কোষ, কোষীয় উপাদান কিংবা তাদের বিপাকীয় কার্যক্রমে উৎপন্ন কিছু উপাদানকে বোঝানো হয়, যেগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পোষক প্রাণীর স্বাস্থ্য ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পোস্টবায়োটিকের কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যবহৃত উপাদান, প্রয়োগের মাত্রা, খাদ্যের গঠন, মাছের প্রজাতি এবং চাষের পরিবেশের ওপর।
সাইফি নাসিরের গবেষণায় Kluyveromyces marxianus প্রজাতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি পোস্টবায়োটিক সম্পূরকের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাঙ্গাসের খাদ্যে এর বিভিন্ন মাত্রা ব্যবহারের মাধ্যমে বৃদ্ধি, বায়োমেট্রিক সূচক ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার পরিবর্তন মূল্যায়ন করাই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। তবে এ ধরনের সম্পূরককে পাঙ্গাসের মড়কের নিশ্চিত প্রতিকার হিসেবে বিবেচনা করার আগে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল, পরীক্ষামূলক প্রমাণ এবং স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আকস্মিক মৃত্যুহার: খামারিদের বড় উদ্বেগ
ত্রিশাল ও ভালুকার পাঙ্গাসচাষিদের জন্য জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কাল বিশেষভাবে উদ্বেগের হয়ে উঠেছে বলে জানান গবেষক। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ সময় আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বড় আকারের পাঙ্গাস হঠাৎ মারা যায়। খামারিরা সমস্যার কারণ বুঝে ওঠার আগেই একসঙ্গে অনেক মাছ মারা যাওয়ায় উৎপাদন ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে মাছের আকস্মিক মৃত্যুর পেছনে কেবল তাপমাত্রা বা আবহাওয়াকে দায়ী করা যায় না। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি, অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য পানির গুণগত সূচকের অবনতি, রোগজীবাণুর সংক্রমণ, অতিরিক্ত মাছ মজুত, খাদ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং পরিবেশগত চাপও মৃত্যুহার বাড়াতে পারে। ফলে পাঙ্গাসের মড়ক প্রতিরোধে নিয়মিত পানির গুণমান পরীক্ষা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন নিশ্চিত করা, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার সুফল খামারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য
সাইফি নাসির বলেন, তার গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু বৈজ্ঞানিক ফলাফল অর্জন নয়; বরং গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজে লাগানো। বিশেষ করে প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক মৎস্যচাষিরা যেন উন্নত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কৌশল সম্পর্কে জানতে পারেন এবং উৎপাদনক্ষতি কমানোর কার্যকর উপায় খুঁজে পান, সেটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে কৈ, তেলাপিয়া এবং অন্যান্য চাষযোগ্য মাছের মৃত্যুহার কমানোর সম্ভাব্য উপায় নিয়েও গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন মাছের প্রজাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও প্রমাণভিত্তিক চাষপদ্ধতি উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশের মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎপাদনকালীন ক্ষতি কমানোও সমান জরুরি। পাঙ্গাসের আকস্মিক মৃত্যুহার মোকাবিলায় পোস্টবায়োটিকের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে সাইফি নাসিরের গবেষণা তাই আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের দাবি রাখে। গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ, বিভিন্ন পরিবেশে পুনরায় পরীক্ষা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা যাচাই করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পুষ্টিভিত্তিক প্রযুক্তি মৎস্যচাষিদের জন্য কতটা কার্যকর হতে পারে, তা আরও নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
গবেষক পরিচিতি: সাইফি নাসির একজন লেখক, গবেষক ও অ্যাকুয়াকালচার নিউট্রিশনিস্ট। তার কর্মক্ষেত্র ঢাকা, বাংলাদেশ।
যোগাযোগ: +8801762-019343 (WhatsApp)