16/10/2026
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#পর্ব_৪১
মেহেরুন জবাব না দিয়ে নির্নিমেষ ওয়াহীদকেই দেখে। লোকটার কেমন পাগল পাগল অবস্থা যেন। হয়তো এখনো সব বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। না করারই কথা। যে পরিস্থিতিতে দুজন আলাদা হয়েছিল ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এমন একটা কথা কারোরই হজম হবে না। এ অস্বাভাবিক কিছু নয়। মেহেরুন ওয়াহীদকে সময় দিল। ওয়াহীদ বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলছে। কেমন করে যেন বাচ্চা মেয়েটাকেও দেখছে একটু পরপর। মুন নির্লিপ্ত। সে নিষ্পলক তার বাবাকেই দেখছে। বাবা কেন এমন করছে সে জানে না, বোঝে না। ভাবছে, হয়তো মিশনে থাকায় বাবা তার জন্মের কথা শোনেইনি। আজ শুনে সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। তাও ভালো! বাবাকে এই অজুহাতে একটু সারপ্রাইজ তো দেওয়া গেল।
মেয়েটা হাসল তখন। বাবার হাত ঝাঁকিয়ে বলল, 'বাবা, তুমি কি আমাকে দেখে সারপ্রাইজড হয়েছ? তুমি আমার কথা জানতে না, তাই না? আসলে তুমি মিশনে ছিলে তো তাই তোমার কাছে কোনো খবর পাঠানো যায়নি। নয়তো ওরা তো তোমাকে মিশন থেকে বের করে দিত।'
ওয়াহীদ তখন ধপ করে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল তার সামনে। দু হাতের আজলায় মেয়ের ছোট্ট, মিষ্টি মুখটা আগলে ধরে বলল, 'তুমি আমার মেয়ে? আমি বাবা তোমার? আমি? এত অন্যায়ের পরেও আল্লাহ আমায় এত বড়ো একটা উপহার দিলেন? সত্যি দিলেন? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, মা। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।'
ওয়াহীদের চোখের কোণে পানি টলমল করছে। একটুখানি সুযোগ খুঁজছে সব বের হয়ে আসার জন্য। মেয়েটা চট করে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। ওয়াহীদের মনে হলো, বুকের ভেতর থেকে খুব ভারী কিছু একটা সরে গেল যেন। বুকটা এত হালকা, এত শান্ত লাগল! এত সুখ সুখ অনুভূতি তার আগে হয়নি। আগে কখনো বুকের ভেতরে এতটা প্রশান্তির স্রোত বয়নি। কখনোই এত শান্তি শান্তি অনুভূতি হয়নি মনে। কখনোই না। তবে আজ কেন? কেন? শুধুমাত্র এই বাচ্চাটা তার মেয়ে বলে? সে তার বাবা বলে? বাবা হওয়ার অনুভূতির এত চমৎকার? এত দারুণ? অথচ, অথচ সেই এই অসাধারণ অনুভূতি থেকে ছয় ছয়টা বছর দূরে ছিল! অনেক দূরে।
দু হাতে মেয়েকে শক্ত করে চেপে ধরে হুঁ হুঁ করে কাঁদতে আরম্ভ করল ওয়াহীদ। মেহেরুন চমকাল, থমকাল। ওয়াহীদকে যে কখনো এভাবে কাঁদতে দেখেনি। এভাবে, বাচ্চাদের মতো। ওয়াহীদ কেঁদেই চলছে। চোখ ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে আসা উষ্ণ জলরাশিগুলো আজ সবাইকে জানান দিচ্ছে তার ভেতরে দুঃখের পরিমাণ। জানান দিচ্ছে, নিজের অন্যায়ের জন্য আজ সে ঠিক কতটা অনুতপ্ত, কতটা অসহায়। ভেতরটা ঠিক তার কতটা পুড়ছে। বাবার এমন কান্না মুন সহ্য করতে পারছে না। বাবাকে ছেড়ে তুলতুলে দু হাতে তার চোখ মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
'কাঁদছ কেন, বাবা? আমি তো এখানেই আছি। তোমার কাছে। কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমারও যে খুব কান্না পাবে।' বলেই সে ঠোঁট উল্টাল। ওয়াহীদ মেয়ের মুখে অজস্র চুমু এঁকে বলল,
'তুমি বাবার সাথে এতদিন কেন যোগাযোগ করোনি, মা? কেন বাবাকে তোমার কথা জানাওনি? বাবা তবে সব ছেড়ে তোমার কাছে ছুটে আসতাম।'
মুন নাক টেনে বলল, 'তাহলে তো তোমার মিশনটা কমপ্লিট হতো না। তাই তোমাকে কেউ আমার কথা জানায়নি।'
মিশনের ব্যাপারটা যে কেবলই একটা বাহানা তা ওয়াহীদ বেশ বুঝতে পারল। উঠে দাঁড়াল সে। তাকাল মেহেরুনের দিকে। হতভম্ব, হতবাক গলায় জিজ্ঞেস করল,
'আমায় এভাবে শাস্তি দিলে, মেহেরুন? এভাবে? এই ছয় বছরে একটাবারের জন্যও তোমার মনে হলো না, আমার মেয়ের কথা, আমার সন্তানের কথা আমারও জানা উচিত? মনে হলো না তোমার? ওইটুকু অধিকারও কি আমার ছিল না? আমার রক্তকে, আমার সম্পদকে এভাবে আমার থেকে আড়াল করে রাখতে তুমি কীভাবে পারলে মেহেরুন? কীভাবে? একটুও মায়া হলো না বুঝি আমার উপর? একটুও না?'
কাতর শোনাল ওয়াহীদের গলার স্বর। আশেপাশের মানুষগুলো তাদের দেখছে। অপ্রস্তুত মেহেরুন। খুবই অপ্রস্তুত। মাথাটা নামিয়ে নিল। ওয়াহীদের কান্না থামলেও চোখগুলো এখনো ভেজা, রক্তিম। ঠোঁট দুটোতে অল্প ফাঁক। কাঁপছে সেগুলো। মেহেরুন জবাব দিতে সময় নিল অনেকটাই। এর আগে মেয়েকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে ওয়াহীদকে নিয়ে একপাশে কর্ণারে দাঁড়াল। অত কথা মেয়ের সামনে বলা যায় না যে। এরপর শুরু করল ক্ষীণ সুরে,
'যখন মুনের কথা প্রথম জানতে পেরেছিলাম তখন আমার বাবা আপনার নাম্বারে কল দিয়েছিলেন। সেটা বন্ধ ছিল তখন। না পেয়ে আপনার বাবাকে কল দেওয়া হয়, আপনার খোঁজ নেওয়া হয়। আপনার বাবাও যখন আপনার কোনো খোঁজ দিতে পারছিলেন না তখন আমি নিজ থেকেই বাবাকে এই বিষয়টা আপনাদের জানাতে বারণ করি। আমার মনে হয়েছে, আমার বা আমার মেয়ের কোনো গুরুত্ব আপনার জীবনে নেই। বরং আমরা আলাদা থাকলেই ভালো থাকব। একসাথে থেকে দিনের পর দিন মা বাবার ঝগড়া ঝামেলা দেখে মানসিক অশান্তির মাঝে বড়ো হওয়ার চেয়ে মা বাবার সাথে আলাদা থেকে, সম্মানজনক সম্পর্ক দেখে বড়ো হওয়াটা অধিক ভালো। এতে বাচ্চাদের মন কিংবা মস্তিষ্কের উপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়ে না।'
ওয়াহীদ কপাল কুঁচকে বলল, 'এটাই কারণ? এটা? এর জন্য তুমি একজন বাবাকে তার বাবা হওয়ার সুসংবাদটা পর্যন্ত দিলে না? ছয়টা বছরে তার মেয়েটার সাথে একটাবারের জন্যও যোগাযোগ করালে না? শুধু এই কারণে? কোন বাবা-মা, কোনো স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ঝামেলা হয় না, মেহেরুন? তুমি বলতে পারবে, কোন সংসারে জীবনে কখনোই কোনো অশান্তি হয়নি? মানছি আমি বাড়াবাড়িটা বেশিই করে ফেলেছিলাম, মানছি আমার অন্যায়টা ক্ষমার অযোগ্য ছিল, তাই বলে তুমি আমায় এভাবে শাস্তি দিবে? এত নিষ্ঠুর, নির্দয় তুমি কেমন করে হতে পারলে, মেহেরুন? কেমন করে?'
ওয়াহীদ অস্থির হয়ে উঠল খুব। ভীষণই। দু হাত নিজের চুলগুলো টেনে ধরল। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলল কয়েকবার। সে মানতেই পারছে না। কষ্ট হচ্ছে তার। খুব কষ্ট হচ্ছে। সে বাবা হয়েছিল, তার একটা ছোট্ট পুতুল, একটা ছোট্ট রাজকন্যা হয়েছিল। সেই রাজকন্যার আজ ছয় বছর, কতগুলো দিন, কতগুলো মাস! কেমন করে পারল মেহেরুন? কেমন করে? তার মেয়ে পৃথিবীতে আসার পর সে মেয়েকে ছুঁতে পারেনি, তার ছোট্ট শরীরটাকে খুব যত্নে, খুব আদরে বড়ো করতে পারেনি। কত কিছু সে দেখেনি, কত অনুভূতি সে পায়নি! তার একটা ভুল, একটা অন্যায়, এভাবে তার থেকে সব কেড়ে নিল? এভাবে?
ওয়াহীদ আর না পেরে সামনের দেয়ালটাতে জোরে ঘুষি মেরে বসে। মেহেরুন চমকায়। আশপাশের মানুষগুলো ভড়কে যায় সব। মেহেরুন দ্রুত সামলাতে চায় তাকে, 'কী করছেন? মেয়েটা দেখছে। প্লিজ শান্ত হোন।'
ওয়াহীদ আবারও ভেঙে পড়ে। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠে বলে, 'আমি কেমন করে শান্ত হব, মেহেরুন? কেমন করে? তোমার গর্ভে যখন আমার সন্তান ছিল তখন তোমার ওই রূপ, ওই সৌন্দর্য আমি দেখতে পারিনি। মেনে নিলাম না হয়। এরপর মেয়েটা যখন হলো। ওর ছোট্ট শরীরটাকে সবার আগে আমার কোলে দেওয়া হলো না। আমাকে জানোনাই হলো না, আমি যে বাবা হলাম। ওর হাত পা নাড়ানো, ওর কান্না, আদু আদু বুলি, প্রথম বাবা ডাকা, প্রথম হাঁটা, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, এসব কিছুই যে আমার দেখা হলো না, মেহেরুন। কোনো অনুভূতিই যে আমার পাওয়া হলো না। অথচ, অথচ এসব কিছু আমার পাওয়ার কথা ছিল, সবকিছুই আমার হওয়ার কথা ছিল। আমি এখন কী করে শান্ত হব, বলো? কী করে?'
হাঁপাতে আরম্ভ করল ওয়াহীদ। শ্বাসকষ্ট রোগীদের মতো শ্বাস নিতে আরম্ভ করল। মেহেরুন ঘাবড়াল খুব। বলল, 'শান্ত হোন, ওয়াহীদ। এমন করছেন কেন?'
ওয়াহীদ ঝটপট তার প্যান্ট আর শার্টের পকেট হাতায়। কিছু একটা খুঁজছে সে। মেহেরুন বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী খুঁজছেন?'
কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। শ্বাসে টান পড়ছে। তাও কোনোরকম বলল, 'আমার ইনহেলার! আমার ইনহেলারটা কোথায়?'
'আপনার কি শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? ইনহেলার লাগবে?'
ওয়াহীদ ঢোক গিলে মাথা ঝাঁকাল। মেহেরুন ভয় পেল এবার। সে এখানে ইনহেলার কোথায় পাবে? লোকটার কবে থেকে এই সমস্যা? আগে তো ছিল না। সে অসহায় হয়ে এদিক ওদিক চাইল। বাবার এমন অবস্থা দেখে মুনও ছুটে এল সেখানে। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'বাবার কী হয়েছে, মা? বাবা অমন করছে কেন?'
'কিছু হয়নি, মা। বাবা ঠিক আছে। একদম ঠিক আছে। তুমি বাবাকে নিয়ে গিয়ে ওখানে বসাও।'
মুন বাবার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে সোফায় বসাল। তার বুকটা হাত দিয়ে ঘঁষতে ঘঁষতে বলল, 'বাবা, তোমার কি শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে?'
ওয়াহীদ ছলছল চোখে মেয়েটার মুখের দিকে তাকায়। কান্না পায়, তার খুব কান্না পায়। নাক টেনে, মাথা নেড়ে বোঝায়, তার খুব কষ্ট হচ্ছে।
মেহেরুন ছুটে রিসেপশনে গিয়ে একটা ইনহেলারের ব্যবস্থা করতে বলে। ওই মুহূর্তে হোটেলে ইনহেলার নেই। না থাকারই কথা। একজন স্টাফ বাইরে থেকে আনতে যায়। কিন্তু অত সময় বোধহয় হবে না। ওয়াহীদের অবস্থা বেগতিক। লোকটার শ্বাসকষ্টের যে এত ভয়াবহ দশা তা মেহেরুনের জানা ছিল না। সে আতঙ্কিত হলো খুব। চারপাশে জড়ো হলো অনেকেই। একেক জন একেক ধরণের পরামর্শ দিতে থাকল। তবুও কেউ এগিয়ে এসে তাদের একটু সাহায্য করল না। কোনো উপায় না পেয়ে মেহেরুন অ্যাম্বুলেন্স ডাকল একটা। এখনই ওয়াহীদকে হাসপাতালে নিতে না পারলে খারাপ কিছু একটাও হয়ে যেতে পারে।
চলবে...
সংগ্রহীত.....