02/06/2026
ঘটনা-১
কুমিল্লার মেয়ে রুখসানা আখতার (২৮) পড়ালেখা করেছেন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। এরপরই বিয়ে হয়ে যায়। দুই বছর আগে রুখসানার বিবাহবিচ্ছেদ হলে সব এলোমেলো হয়ে যায়। বিচ্ছেদের পর বড় সন্তানটিকে নিয়ে যাওয়া হয় তার কাছ থেকে। ছোটো সন্তান থাকে রুখসানার কাছেই।
কিন্তু রুখসানা তার দুই মেয়েকেই নিজের কাছে বড় করতে চান। বড় মেয়েকে কাছে আনতে গত দেড় বছর ধরে তিনি আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। প্রথমে কোর্ট-কাচারি, এরপর সামাজিক যত উপায় আছে সবকিছুই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি।
স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর থেকে তিনি মায়ের বাড়িতেই থাকছেন। সারাদিন দরজা আটকে থাকতে থাকতে রুখসানাও ধীরে ধীরে পড়ে যান একাকিত্ব এবং হতাশায়। দেখা দেয় ইনসমনিয়া। একদিন ফোনে এক হুজুরের খোঁজ পান। সামাজিক, আইনত আর কোনোভাবেই যখন নিজের মেয়েটিকে কাছে পাচ্ছিলেন না, তখন শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ওই হুজুর। মেসেঞ্জারে সবকিছু খুলে বলেন রুখসানা। উত্তর আসে: 'দশ মিনিটেই এর সমাধান সম্ভব। আগে কাজ হবে এরপর দরকার হলে টাকা দিবেন।''
এই কথা শুনে রুখসানা আশ্বস্ত হন। মনে যে ভয় ছিল অপরিচিত হুজুরের কাছে সাহায্য চাওয়া নিয়ে, সেটাও কেটে গেল। এরপর তাকে বলা হয় ফার্মেসী থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কিনে আনতে (চিকিৎসাবিজ্ঞানে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবহৃত হয় অ্যান্টিসেপ্টিক ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান হিসেবে। সাধারণত প্রাথকমিকভাবে ক্ষত পরিষ্কার ও ত্বককে জীবাণুমুক্ত রাখতে ফার্মেসিগুলোতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বিক্রি হয়)।
পটাশ কী, না জানলেও হুজুরের পাঠানো ছবি ও নির্দেশনা মোতাবেক কয়েক প্যাকেট পটাশ কিনে নিয়ে আসেন রুখসানা। পটাশের সাথে চিনিও রাখতে বলা হয় তাকে। রাত আড়াইটায় কাজ শুরু হবে। রুখসানাও তাই কথামতো পটাশের প্যাকেট, চিনি ও জায়নামাজ নিয়ে বসেন। সময়মতো এল ভিডিওকল। তাকে বলা হলো, মুখ দেখাতে হবে না। শুধু হাতের তালু্র দিকে ক্যামেরা ধরে রাখতে। এ কথা শুনে রুখসানার আস্থা বেড়ে যায় আরও।
রুখসানা বলেন, 'একপর্যায়ে সে আমাকে ওই পটাশের সাথে চিনি তালুতে নিয়ে একসাথে মিশিয়ে হাত মুঠো করে চেপে ধরতে বললো। আমিও ধরে থাকলাম। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় আমার হাতে ভীষণ জ্বালাপোড়া করতে শুরু করলো। তখন সে বলে, "শক্ত করে ধরে থাকুন মা। এখনই কাজ হচ্ছে। হাত ছেড়ে দিলেই বিপদ! ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসবে আপনার ওপর। এমনকি আপনার মা মারাও যেতে পারে।'" ওদিকে জ্বালাপোড়া বাড়ছেই। তবু ধরে ছিলাম হাত মুঠো করে। একপর্যায়ে আর পারছিলাম না, হাত ছেড়ে দিই।'
পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO4) অত্যন্ত শক্তিশালী জারক পদার্থ। আর চিনি হলো বিজারক। চিনি ও পটাশের মিশ্রণে তাই একটি তীব্র জারণ-বিজারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। যখন শুষ্ক পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের গুঁড়োর সাথে চিনি মেশানো হয় এবং তাতে সামান্য চাপ বা ঘর্ষণ দেওয়া হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তীব্র আগুন ও ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। রুখসানার বেলায় ঠিক তা-ই ঘটেছে।
আর মূল নাটক এখান থেকেই শুরু। হাতের এই অবস্থা কী করলে ভালো হবে, জিজ্ঞেস করামাত্রই শুরু হয় টাকা চাওয়া। টাকা না দিলে হাতের আরও বড় ক্ষতি হবে, এসব ভয় দেখানো শুরু করে। রুখসানা ঠিকই তখনই বুঝতে পারেন কী ভুল তিনি করেছেন। কিন্তু পরিবারের কাউকে নিজের বোকামির কথা বলার সাহস করতে পারছিলেন না। কিন্তু রাত পোহাতেই তালুর ভেতরের মাংস ফুলে ওঠে তার। এরপর অগত্যা মাকে নিয়ে ছুটতে হয় হাসপাতালে।
ঘটনা-২
মেয়ে শ্রাবণী মজুমদারকে রেখে বাবা-মা দুজনেই বেরিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। মেয়েকে যেন চুলোর কাছে যেতে না হয়, তাই কিছু টাকাও রেখে গেছেন খাবার অর্ডারের জন্য। ডাক্তার দেখানোর মাঝেই মেয়ে শ্রাবণী ফোন দিয়ে শুরু করে দিল কান্নকাটি। তার হাত পুড়ে গেছে। বাবা-মা জলদি বাসায় ফিরে এসে দেখেন, মেয়ের বুকসহ ডান হাতের তালু পুড়ে চামড়া উঠে আছে।
জানতে পারেন, তারা বাসা থেকে বের হয়ে যাবার পর শ্রাবণী বের হয় দোকান থেকে পটাশ কিনতে। ভারতের এক ছেলের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে শ্রাবণীর ভালো লাগা ছিল। এ নিয়ে অনেক পাগলামিই সে করেছে। এরমধ্যেই সে অনলাইনে পেয়েছে এক কবিরাজ-তান্ত্রিকের খোঁজ।
সেই তান্ত্রিকও একইভাবে শ্রাবণীকে বলেন পটাশ কিনে আনতে। সেদিন বাসা ফাঁকা পেয়ে সে-ও গিয়ে পটাশ কিনে আনে। এরপর তাকে যেভাবে বলা হয়, সেভাবেই ডান হাতে পটাশ-চিনি মিশিয়ে করে মুঠো করে শক্ত করে ধরে ছিল বুকের সাথে। আর এরপরই ঝলসে যায় হাতসহ বুকের চামড়া।
এরপর শ্রাবণীকেও বলা হয় মিষ্টির টাকা পাঠাতে। তবে তাকে বলা হয় কালী পূজার কথা। বলা হয়, মা কালীকে খুশি করতে তার জন্য পূজো দেয়া হবে। আর সে পূজার জন্য মিষ্টি কিনে দিলেই আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবে হাত।
কিন্তু ব্যাথায় কাতর শ্রাবণী হাত পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই বাবা-মাকে ফোন দেয়। ফলে কোনো টাকা নিতে পারেনি শ্রাবণীর থেকে। কিন্তু এই ফাঁদে পড়ে কখনো ১০ হাজার, কখনো ৩০ হাজার কখনো বা বলা হয় ৭০ কেজি মিষ্টির টাকা পাঠিয়ে দিতে।
কেউ কেউ ব্যাথায় কাতর হয়ে হাত ঠিক হবে, এই আশায় টাকা পাঠিয়েও দেন। তাতেও যখন কাজ হয় না তখন খেয়াল হয়। আবার কেউ কেউ ভয় পেয়ে পরিবারকে না জানিয়ে ধাপে ধাপে টাকা পাঠাতেই থাকেন। এভাবে ১ লাখ টাকা গচ্চা গেছে এমন রোগীও পেয়েছেন তারা।
থেরাপিস্ট রেহনুমা জানান, 'একবার আমরা একজন পুরুষকে পেয়েছিলাম, মধ্যবয়সি ছিলেন। রাতারাতি ধনী হবার ইচ্ছে থেকে এই ফাঁদে পা দেন। সেই লোকের থেকে এক লাখ হাতিয়ে নিয়েছিল এ গোষ্ঠী। তবে এরা এক নাম্বার বেশিদিন ব্যবহার করে না। একবার ধরা খেলে ওই নাম্বার সম্ভবত বদলে ফেলে।'
রুখসানা, ইশরাত, শ্রাবণী ও তানিয়ার মতো আরও কয়েকজনের সাথে কথা বলে টিবিএস। তাদের থেকে প্রতারণাকারী এসব পেজ ও ভন্ডদের মোবাইল নাম্বারও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য প্রদত্ত নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করা হলে বেশিরভাগ নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। কেবল একটি নাম্বারে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। নাম আলম হুজুর।
তার সাথে টিবিএসের কথোপকথন হুবহু তুলে ধরা হলো (কিছু বানোয়াট সমস্যা বলা হয় তাকে):
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম, আলম হুজুরের নম্বর এটা?
আলম: জি বলুন মা, কী সমস্যা?
প্রশ্ন: এখানে কি সব সমস্যার সমাধান হয়?
আলম: হ্যাঁ মা, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা ছাড়া সব সমস্যাই সমাধান সম্ভব। আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি প্রেমিক বা স্বামীকে নিজের কাছে আনতে চাচ্ছেন। আপনি কি বিবাহিত?
প্রশ্ন: না আমি একজনকে পছন্দ করি।
আলম: বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে আপনাকে চায় না। তাই তো?
প্রশ্ন: হ্যাঁ।
আলম: সমস্যা নেই। একসাথে সংসার করবেন, বিয়ে করবেন, এটা তো সুন্দর চাওয়া। ইনশাআল্লাহ হবে, আপনার এই সমস্যা সমাধান করতে কেবল একদিন লাগবে। খালি আপনাকে কিছু কাজ করতে হবে। ভয় পাবেন না।
প্রশ্ন: কী কাজ? টাকা দিতে হবে অনেক?
আলম: না টাকা আগে দিতে হবেনা। আগে আপনি মা কাজটা দেখেন। এরপর বিশ্বাস করলে করবেন। শুধু আপনাকে তেরোটি মোমবাতি কিনতে হবে, তিনটি গোলাপফুল কিনতে হবে। ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে ভিডিওকলে থাকবেন, সব দেখবেন নিজের চোখেই। সাথে আপনার নাম, এক কপি ছবি আর ওই ছেলের নাম দিতে হবে। কাজ হওয়ার পর শুধু জিনকে খুশি করার জন্য এক মণ মিষ্টির টাকা পাঠাবেন আর আমার জন্য নামাজ পরে দোয়া করবেন আল্লাহর দরবারে।
প্রশ্ন: কিন্তু এত টাকা?
আলম হুজুর: সমস্যা নেই মা। যতটুকু পারবেন ততটুকু দিলেই হবে। জিনকে খুশি করা শুধু।
প্রশ্ন: আমার তো স্মার্টফোনও নেই। তাহলে কি আমার কাজ হবে না?
আলম: স্মার্টফোন না থাকলে তো ঝামেলা। নিজের চোখে না দেখলে তো আপনি প্রমাণ পাবেন না আমাদের কাজের। আমরা যে আসলেই কাজ সমাধান করি তা বুঝতে পারবেন না।
প্রশ্ন: এছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার সমস্যা সমাধানের?
আলম: তাহলে এক কাজ করতে হবে মা, কি আর করার। আপনি এভাবেই ফোন দিয়েন। আমি আপনাকে বলছি কী কী কিনতে হবে। পটাশ কিনবেন ছয় প্যাকেট আর মিষ্টি কিনবেন এক প্যাকেট। সাদা মিষ্টি। বেশি টাকা খরচও হবে না। আপনি কিনে এনে আমাকে কল দিবেন। আমি ফোনেই আপনাকে বলে দিব কী করতে হবে। এরমধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন। নামাজ বাদ দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: জি, আচ্ছা। আপনাকে ফোন দিব।
আলম: ঠিক আছে, মা। যা যা বলছি, তা কিনে ফোন দিবেন। আমি সব সমস্যা সমাধান করে দিব একদিনেই ইনশাআল্লাহ। তবে খবরদার কাজ আদায় হওয়ার আগপর্যন্ত কাউকে জানাবেনা না। মা-বাবা কাউকে না। এতে কাজের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি। আপনি ভরসা রাখেন। আমরা আল্লাহর নামে কাজ করে দিব।
কবিরাজ-তান্ত্রিক সেজে একেকসময় একেক রূপে এভাবেই প্রথমে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে তারা। ধীরে ধীরে তাদের উদ্দেশ্যের দিকে আগায়। কেউ স্বামী, কেউ প্রেমিককে কাছে টানতে, কেউ ফর্সা হতে, কেউ টাকাপয়সা পাওয়ার লোভে এমন পটাশ-চিনি দিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলছে। যারা বুঝতে পারে, তারা হয়তো দ্রুতই বেরিয়ে এসে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে। আর যারা বোঝে না, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরেও টাকা দিয়ে যায় ভালো হবার আশায়। আর এভাবেই সমস্যা সমাধানের শর্টকাট আশা দেখিয়ে এক শ্রেনীর লোক হাতিয়ে নিচ্ছে টাকাপয়সা। সেইসাথে নষ্ট করে দিচ্ছে ভুক্তভোগীর হাত।