10/04/2026
খনার বচন পড়েছি কিন্তু খনা কে জানতাম না।
https://www.facebook.com/share/184rFS268m/
খনা: যে প্রতিভাকে চুপ করানো গেলেও মুছে ফেলা যায়নি
একটি ধারালো তলোয়ার। নিজের স্ত্রীর জিভ কেটে নেওয়ার নির্দেশ। আর সেই নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং শ্বশুর।
মেয়েটির অপরাধ? সে তার সময়ের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের চেয়েও বেশি মেধাবী ছিল।
ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল যে নামটি, সেটি হলো— খনা।
খনার জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন প্রাচীন বাংলার দেউলি গ্রামে, বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ের কাছে তাঁর জন্ম। আবার লোককথা অনুযায়ী তিনি জন্মেছিলেন সিংহলে, আজকের শ্রীলঙ্কায়।
গল্পের শুরু আরও নাটকীয়। রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের অন্যতম, প্রখ্যাত জ্যোতিষী বরাহমিহির একদিন গণনা করে দেখলেন তাঁর নবজাতক পুত্র মিহিরের আয়ু মাত্র এক বছর। শোকাহত পিতা ছেলেকে একটি তামার পাত্রে ভাসিয়ে দিলেন সমুদ্রে। সেই পাত্র ভাসতে ভাসতে পৌঁছাল সিংহলে। সেখানেই বড় হতে থাকে মিহির। আর সেই রাজকীয় পরিবেশেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় এক ব্যতিক্রমী মেধাবী কন্যা খনার। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত এবং আবহাওয়াবিদ্যায় এক বিরল প্রতিভা।
বিয়ের পর খনা নিজে গণনা করে প্রমাণ করলেন যে বরাহমিহিরের সেই পুরনো হিসাব ভুল ছিল। মিহিরের আয়ু এক বছর নয়, পুরো একশো বছর। এরপর দম্পতি ফিরে এলেন উজ্জয়িনীতে।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো অন্যখানে। রাজসভায় একের পর এক বিষয়ে খনার মেধা ও বিচক্ষণতা বরাহমিহিরকে ছাপিয়ে যেতে লাগল। রাজা বিক্রমাদিত্য একবার তারার অবস্থান সংক্রান্ত একটি জটিল গাণিতিক সমস্যা উপস্থাপন করেন, যার সমাধান করতে বরাহমিহির ব্যর্থ হন। অন্তঃপুরে বসে খনা মুহূর্তের মধ্যে সেই ধাঁধার উত্তর দিয়ে দেন। কৃষি, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়া নিয়ে তাঁর নিখুঁত পূর্বাভাস দেখে স্বয়ং রাজাও চমকে গেলেন।
যে সমাজে নারীর স্থান ছিল কেবল অন্তঃপুরে, সেখানে একজন নারী রাজ্যের সর্বোচ্চ পণ্ডিতকে চ্যালেঞ্জ করছেন— এটা মেনে নেওয়া সম্ভব হলো না। নিজের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে বরাহমিহির ছেলে মিহিরকে নির্দেশ দিলেন খনার জিভ কেটে নিতে, যাতে সে আর কখনো কথা বলতে না পারে, জ্ঞান বিতরণ করতে না পারে।
পিতার আদেশ এবং অন্ধ সংস্কারের চাপে সেদিন মিহির নিজের হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্ত্রীর জিভ কেটে দিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এবং বুকভাঙা অপমানে কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যু হলো খনার।
মিহির বাকি জীবন অনুশোচনায় কাটিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। আর বরাহমিহিরের পাণ্ডিত্য একটি অমোচনীয় কলঙ্কের দাগ বহন করে চলেছে।
সমাজ কি পারল তাঁর মেধা মুছে দিতে? একদমই না।
হাজার বছর পরেও বাংলার কৃষকরা খনার বচন মেনে চাষাবাদ করেন। আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান ও আবহাওয়াবিদ্যা প্রমাণ করছে, তাঁর প্রতিটি পর্যবেক্ষণ ছিল যুক্তিসম্মত ও বৈজ্ঞানিক।
১. মাটির গুণ ও চাষের গভীরতা
“ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা; তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।”
মূলার জন্য গভীর ও ঝুরঝুরে মাটি দরকার, তুলার জন্য মাঝারি প্রস্তুতি, ধানের জন্য কাদামাটি আর পানের বরজে মাটি বেশি খোঁড়া ক্ষতিকর আজকের কৃষিবিজ্ঞান হুবহু এই কথাই বলে।
২. কলা চাষের অর্থনীতি
“কলা রুয়ে না কেটো পাত। তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।”
পাতা না কাটলে গাছের পুষ্টি অটুট থাকে, ফলন ভালো হয়। একটি কলাবাগান একটি পরিবারের সারা বছরের অর্থনৈতিক সংস্থান করতে পারে এটি কার্যত একটি টেকসই কৃষি মডেল।
৩. আবহাওয়ার পূর্বাভাস
“যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ।”
মাঘের শেষে বৃষ্টি হলে মাটির আর্দ্রতা বাড়ে, রবিশস্যের ফলন ভালো হয়, দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। স্যাটেলাইট-বিহীন যুগে এই পর্যবেক্ষণ ছিল অসাধারণ।
৪. বাঁশ চাষের কৌশল
“গোলে জল মূলে মাটি, তবে হবে বাঁশের আঁটি।”
বাঁশের গোড়ায় যেন জল না জমে এবং পর্যাপ্ত মাটি থাকে— এই সরল নির্দেশটি মেনে চললে ফলন বহুগুণ বাড়ে।
৫. মাটির ধরন ও ফসলের মিল
“আম ফলে বালিতে, তেঁতুল ফলে লালিতে।”
আম চাই বেলে মাটি বা ভালো নিষ্কাশনযুক্ত জমি; তেঁতুল ভারী বা আঠালো মাটিতেও জন্মায়— আধুনিক মৃত্তিকাবিজ্ঞান এই পার্থক্য স্বীকার করে।
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ‘খনা’ আসলে কোনো একজন ব্যক্তি নন— তিনি প্রাচীন বাংলার কৃষিভিত্তিক বিজ্ঞান ও স্থানীয় জ্ঞানচর্চার প্রতীক। আর বরাহমিহির হলেন বহিরাগত ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের প্রতীক। এই দৃষ্টিতে খনার জিভ কাটার গল্পটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়— এটি বাংলার নিজস্ব বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চাকে ক্ষমতার দ্বারা স্তব্ধ করে দেওয়ার এক রূপক।
একটি জিভ থামানো গিয়েছিল। কিন্তু হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকা তাঁর বচনগুলো প্রমাণ করে— জ্ঞানকে কখনো সত্যিকার অর্থে স্তব্ধ করা যায় না।
তথ্যসূত্র: ড. দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য; প্রাচীন বাংলার লোককথা ও পুরাণ; চন্দ্রকেতুগড় ও দেউলি গ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।