08/05/2026
*যমুনার চরের চিঠি*
মোঃ তোফায়েল আহমেদ । বাড়ি রাজশাহী, বাগমারা একটি ছোট্ট গ্রামে। ছোটবেলায় বিল, নদী, নালা ভাঙন দেখে বড় হয়েছ। সেই তুমি এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক। পোস্টিং বান্দরবানের এক দূর্গম ক্যাম্পে।
বর্ষাকাল। টানা ৭ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে রুমা উপজেলার এক গ্রামের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। খবর এলো, গ্রামটায় খাবার নেই, ওষুধ নেই। সাথে ৩ জন গর্ভবতী মহিলা আটকা। হেলিকপ্টার নামার জায়গা নেই, আবহাওয়া খারাপ।
ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন, “কে যাবে? ১২ কিলো পাহাড়ি পথ, কোমর পানি, জোঁক আর ধস।”
তুমি এক পা এগিয়ে দিলে। “স্যার, আমি যাব। আমি দীর্ঘ ৬ বছর যমুনার চরে চাকুরী করেছি। সাঁতার আর কাদা আমি চিনি।”
তোমার সাথে আরো দুইজন। পিঠে ৩০ কেজির রেশন, ফার্স্ট এইড, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। তুমি সবার আগে। কারণ তুমি জানো, পানি কোথায় ফাঁকি দেয়। যমুনার চর নাব্যতা ও বন্যায় সিনিয়রদের সাথে নৌকা ঠেলতে ঠেলতে শিখেছ।
পথে একটা ছোট ঝিরি হঠাৎ ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ভয়ংকর হয়ে উঠল। স্রোতের টানে তোমার এক সহযোদ্ধা পা পিছলে পড়ে গেল। সবাই যখন দড়ি খুঁজছে, তুমি দেরি করলে না। লাফ দিলে পানিতে। স্রোতের উল্টো দিকে কেটে গিয়ে ওর কলার চেপে ধরলে। দুজনেই পাথরে বাড়ি খেলে, হাত কেটে গেল। তবু ওকে টেনে তুললে।
গ্রামে পৌঁছাতে রাত ৯টা। পুরো গ্রাম তোমাদের ঘিরে ধরল। এক বুড়ো মা তোমার কাটা হাত দেখে আঁচল দিয়ে বেঁধে দিল। বলল, “বাবা, তোমার বাড়ি কই?”
তুমি হেসে বললে, রাজশাহীর এক ছোট্ট গ্রামে”
বুড়ি মা কেঁদে ফেলল। “আমার নাতিটাও সেনায়। পোস্টিং উত্তরবঙ্গে। তোমাকে দেখে ওর কথা মনে পড়ল।”
সেই রাতে তুমি ঘুমাওনি। তিনজন গর্ভবতী মাকে পালা করে পাহারা দিলে। ভোরে সেনা মেডিকেল টিম আসল। সবাই নিরাপদ।
এক সপ্তাহ পর ছুটিতে বাড়ি এলে। মা তোমার হাতের কাটা দাগ দেখে জিজ্ঞেস করল, “এটা কিসের?”
তুমি শুধু বললে, “যমুনার স্রোতের দাগ, মা। আমরা সৈনিক মানুষের গায়ে এই দাগ থাকেই।”
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু পাতে বড় মাছের পেটি তুলে দিলো।