30/05/2026
ঘরেই কেফির তৈরি করার সময় সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর জীবন্ত গ্রেইনগুলো। যেহেতু এগুলো ব্যাকটেরিয়া এবং ইস্টের একটি জীবন্ত কলোনি, তাই আমাদের দেশের আবহাওয়া এবং অসচেতনতার কারণে এই গ্রেইনগুলো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে। বাংলাদেশে মূলত কিকি কারণে কেফির গ্রেইন নষ্ট হয় এবং তা থেকে রক্ষার উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশের গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরম কেফির গ্রেইনের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু। কেফির গ্রেইন সাধারণত ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো থাকে। আমাদের দেশে যখন ঘরের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি বা তার উপরে চলে যায়, তখন ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত হয়। এই অতিরিক্ত গরমে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের সামলাতে না পেরে পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং একপর্যায়ে গ্রেইনগুলো গলে বা মারা যেতে শুরু করে।
অনেকে দুধ জ্বাল দেওয়ার পর তা পুরোপুরি ঠান্ডা না করেই গ্রেইন মিশিয়ে ফেলেন। কেফির গ্রেইন অত্যন্ত সংবেদনশীল অণুজীব দিয়ে তৈরি। দুধ যদি সামান্য কুসুম গরমও থাকে, তবে সেই তাপে গ্রেইনের ভেতরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়।
আমাদের রান্নাঘরে সাধারণত স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম বা লোহার বাসনকোসন বেশি ব্যবহৃত হয়। কেফির গ্রেইন যদি দীর্ঘক্ষণ কোনো ধাতব পাত্র, ছাঁকনি বা চামচের সংস্পর্শে থাকে, তবে ধাতুর সাথে কেফিরের অ্যাসিডের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এতে গ্রেইনের আয়ু কমে যায় এবং ক্রমান্বয়ে তা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
অনেকের ধারণা প্রতিবার কেফির ছেঁকে নেওয়ার পর গ্রেইনগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। এই কাজ করতে গিয়ে যখন আমাদের দেশের লাইনের সাপ্লাইয়ের পানি (যাতে ব্লিচিং বা ক্লোরিন থাকে) ব্যবহার করা হয়, তখন ক্লোরিনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কারণে গ্রেইনগুলো মারা যায়।
কেফির গ্রেইনের প্রধান খাদ্য হলো দুধের ল্যাকটোজ। আপনি যদি জারে গ্রেইন রেখে দিনের পর দিন দুধ পরিবর্তন না করেন, তবে গ্রেইনগুলো ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। নিজের তৈরি করা অ্যাসিডের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ খাবার ছাড়া ডুবে থাকলে গ্রেইনগুলো একসময় শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং মারা যায়।
কেফির তৈরির পাত্র যদি পুরোপুরি পরিষ্কার বা শুকনো না থাকে, কিংবা বাতাস চলাচলের জন্য মুখ ঢেকে দেওয়ার কাপড়টি যদি নোংরা হয়, তবে বাইরে থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস জারে ঢুকে পড়ে। এগুলো কেফিরের ভালো ব্যাকটেরিয়ার জায়গা দখল করে পুরো কালচারটিকে নষ্ট করে দেয়।
গ্রেইন সুরক্ষা ও বাঁচিয়ে রাখার উপায়গুলো হলো:
অতিরিক্ত গরমের দিনে কেফিরের জারটি ঘরের সবচেয়ে ঠান্ডা জায়গায় রাখুন, যেমন আলমারির ভেতর বা রান্নাঘর থেকে দূরে কোনো অন্ধকার কোণায়। গরম যদি বেশি পড়ে, তবে দিনের বেলা জারটি ফ্রিজের নরমাল চেম্বারে রেখে দিতে পারেন। এতে ফারমেন্টেশন ধীর হবে কিন্তু গ্রেইনগুলো সুরক্ষিত থাকবে। আর দুধ ব্যবহারের আগে তা ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে পুরোপুরি ঠান্ডা করে নেওয়া নিশ্চিত করুন।
কেফির তৈরি, নাড়াচাড়া বা ছাঁকার কাজে ভুল করেও কোনো ধাতব জিনিস ব্যবহার করবেন না। সবসময় কাঁচের জার ব্যবহার করুন। চামচ হিসেবে কাঠের বা সিলিকনের চামচ এবং ছাঁকার জন্য প্লাস্টিক বা নাইলনের ছাঁকনি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
বাস্তবে কেফির গ্রেইন ধোয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। ছাঁকনি দিয়ে কেফির ছেঁকে নেওয়ার পর গ্রেইনের গায়ে যে সামান্য আঠালো অংশ লেগে থাকে, তা আসলে গ্রেইনকে সুরক্ষা দেয়। তাই সরাসরি ছাঁকনি থেকেই গ্রেইনগুলো আবার নতুন দুধে দিয়ে দিন। যদি কখনো ধোয়ার খুব প্রয়োজন মনে হয়, তবে ফুটানো ঠান্ডা পানি বা মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করুন, কখনো সরাসরি ট্যাপের পানি নয়।
যদি নিয়মিত কেফির বানান, তবে প্রতি ২৪ ঘণ্টা পর পর পুরনো দুধ বদলে নতুন দুধ দিন। আর যদি কোনো কারণে কয়েক দিন বা সপ্তাহের জন্য কেফির বানানো বন্ধ রাখতে চান, তবে গ্রেইনগুলো একটি কাঁচের পাত্রে পর্যাপ্ত দুধে ডুবিয়ে ফ্রিজের নরমাল চেম্বারে রেখে দিন। ফ্রিজের ঠান্ডায় গ্রেইনগুলো ঘুমন্ত বা ডরম্যান্ট অবস্থায় থাকবে এবং এক সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো খাবার ছাড়াই ভালো থাকবে। দীর্ঘদিনের জন্য বাইরে গেলে গ্রেইনগুলো ডিপ ফ্রিযে বরফ করে রেখে দেওয়া যায়।
কেফির বানানোর আগে হাত ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। জার ধোয়ার পর তাতে যেন সাবানের অংশ বা পানি লেগে না থাকে। কেফিরের জারটি কাপড়ের সাহায্যে এমনভাবে ঢাকুন যেন বাতাস চলে কিন্তু পিঁপড়ে বা মাছি না পড়ে। প্রতিদিন কেফিরের গন্ধ এবং রং খেয়াল করুন। যদি কেফিরে চমৎকার একটা টক বা চিজের মতো গন্ধ থাকে, তবে গ্রেইন সুস্থ আছে। কিন্তু যদি পঁচা ডিম বা ড্রেনের মতো দুর্গন্ধ বের হয় এবং উপরে কালো বা সবুজ ছাতা পড়ে, তবে বুঝতে হবে তা নষ্ট হয়ে গেছে।
এই সিম্পল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মেনে চললে দেশের যেকোনো আবহাওয়াতেই আপনার কেফির গ্রেইন বছরের পর বছর বেঁচে থাকবে এবং দিন দিন সংখ্যায় বৃদ্ধি পাবে।
#গ্রেইন্স #কেফির_গ্রেইন #কেফির #প্রোবায়োটিক #আইবিএস #কেফিরবীজ