22/02/2026
তারিখ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং
বরাবর,
মাননীয় মন্ত্রী
কৃষি মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
বিষয়: আলু চাষিদের অস্তিত্ব রক্ষা, হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক পুনর্নির্ধারণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আবেদন।
মাননীয় মহোদয়,
আসসালামুয়ালাইকুম।
বিনীত শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক জানাচ্ছি যে, উজ্জল সরকার, মুন্সিগঞ্জ টংগীবারী থানার একজন প্রান্তিক কৃষক ও কৃষকের সন্তান। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কৃষকের সংকট ও বাজার ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা উপলব্ধি করেই বিষয়টি আপনার সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আলু চাষিরা যে নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, তার অভিঘাত এখনো কাটেনি। দুঃখজনকভাবে চলমান ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থাপনা, মূল্য সংরক্ষণ এবং রপ্তানি পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে কৃষি খাতের প্রতি আস্থা ও আগ্রহ দুটিই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত অর্থবছরে আলুর বাজারদর এতটাই কমে গিয়েছিল যে উৎপাদন ব্যয়ও উঠছিলোনা। এই চরম মূল্যধসের কারণে বাজারে বিক্রি করলে নিশ্চিত লোকসান হতো, তবুও নিত্যপ্রয়োজন ও ঋণের চাপের কারণে আমরা কিছু অংশ লোকসানেই বিক্রি করতে বাধ্য হই। বাকি অংশ ভবিষ্যতে বাজারদর বাড়বে এই আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করি। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে বিক্রয়মূল্য থেকে হিমাগারের ভাড়াও ওঠেনি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আলু হিমাগারেই রেখে আসতে হয়েছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ সেই আলু বিক্রি করে নিজেদের ভাড়া সমন্বয় করে নেন, আর কৃষকের আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি তথা শেষ সম্বল পুজি হাড়িয়ে যায়। এর ফলস্বরূপ বহু কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং কেউ কেউ চরম আর্থিক সংকটে জমি বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
ঠিক সেই সময়ে দেশের সকল কোল্ড স্টোরেজ মালিক সমন্বয়হীনভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করেন। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকের স্বার্থরক্ষার প্রধান আশ্রয়স্থল হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি না থাকায় কৃষক চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমান ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাজার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমানে-
গ্যানোলা আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২০-১৫০ টাকা প্রতি মণ
এস্টেরিক্স/ডায়মন্ড/ মিউজিক/ সানসাইন আলু বিক্রি হচ্ছে ২৬০-২৭০ টাকা প্রতি মণ
এই মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত অযৌক্তিক। ফলে কৃষকের শ্রম, সময় ও বিনিয়োগ কোনোভাবেই সুরক্ষিত থাকছে না। কৃষি সমাজ আজ অস্তিত্ব সংকটে উপনীত।
খাতেও কাঙিক্ষত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত নেপালে মাত্র ৩টি ট্রাক (প্রতি ট্রাক ২১ টন হিসেবে মোট ৬৩ টন) আলু রপ্তানি হয়েছে। মালয়েশিয়ায় সপ্তাহে ১-২টি ট্রাক যাচ্ছে। দেশের বিপুল উৎপাদনের তুলনায় এই রপ্তানি পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। উদ্বৃত্ত উৎপাদনকে পরিকল্পিতভাবে রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করানো না গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যধস অব্যাহত থাকবে, যার বোঝা একমাত্র কৃষককেই বহন করতে হবে।
বর্তমানে দেশে ৫০০টির বেশি নন-রেফ্রিজারেটেড স্টোর এবং প্রায় ৪০০টি রেফ্রিজারেটেড স্টোর রয়েছে। কিন্তু আলুর বাজারমূল্য যখন উৎপাদন খরচের চেয়ে কম থাকে, তখন উচ্চ হিমাগার ভাড়া কৃষকের জন্য অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করে। এতে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়, যা বাজারে মূল্যধস সৃষ্টি করে। কৃষকবান্ধব ভাড়া নির্ধারণ করলে সংরক্ষণ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে, বাজারে ধাপে ধাপে সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই টিকে থাকবে। তাই প্রতি কেজি সংরক্ষণ খরচ ৬.৭৫ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ৪.৫০ টাকা করা যেতে পারে।
মাননীয় মহোদয়, আপনি সদ্য এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার নেতৃত্বে কৃষি খাতে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পরিবর্তন সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পূর্ববর্তী বছরের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছেন, তাই এ বছর আগাম পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব বলেই আমরা আশা করি।
এই প্রেক্ষিতে বিনীতভাবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি-
১। উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানিতে দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ।
২। কৃষিতে রপ্তানি প্রণোদনা ও সরকারি ভর্তুকি (Government Export Incentive) বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন।
৩। টিসিবি, ওএমএসসহ সরকারি কর্মসূচিতে আলুর ব্যবহার বৃদ্ধি।
৪। হিমাগার ভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোর তদারকি।
৫। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বচ্ছভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত প্রণোদনা ও সুদবিহীন ঋণ প্রদান।
৬। আলুর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি বাজার স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা।
কৃষক শুধু উৎপাদক নন, তিনি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার রক্ষক। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে কৃষি ব্যবস্থা টেকসই থাকবে না। আমরা চাই না প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হোক, বরং একটি সুসংগঠিত, দূরদর্শী ও কৃষকবান্ধব নীতির মাধ্যমে আলু খাতকে লাভজনক ও স্থিতিশীল করা বিশেষ প্রয়োজন।
আপনার মানবিক বিবেচনা ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে কৃষকদের মুখে আবারও আশার হাসি ফুটবে এই প্রত্যাশাই করছি।
বিনীত নিবেদক,
উজ্জল সরকার
প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষী
টংগীবারি মুন্সিগঞ্জ
মোবাইল: 01632400929 / 01835452705