01/05/2025
মুসলমান হওয়ার জন্য জামাতবদ্ধ জীবন যাপনের অপরিহার্যতা
আল্লাহপাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য এবং ইবাদত করার পদ্ধতি শিক্ষা দানের জন্য কিতাব ও রসুল প্রেরণ করেছেন। হজরত আদম (আ.) প্রথম মানুষ হওয়ার সাথে সাথে ছিলেন প্রথম নবী। বাবা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর আদিবাস ছিল জান্নাত। আল্লাহপাক যখন তাঁদেরকে পৃথিবীতে পাঠান সে সময়ে তাঁরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁদেরকে অভয় বাণী শোনানো হয় যে তাঁর পক্ষ থেকে প্রদত্ত হেদায়াত যারা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই। আল্লাহপাকের বাণী, ‘আমরা বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে কোনো হেদায়াত যাবে তখন যারা আমার সেই হেদায়াত অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় ও দুঃখ-বেদনা থাকবে না’- সূরা বাকারা ৩৮।
মানুষের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অসংখ্য নবী ও রসূল প্রেরণ করা হয় এবং সর্বশেষ রসূল হলেন মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (সা.)। সকল নবী ও রসূলের একই দাওয়াত ছিল- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)। এটা ছিল এক বিপ্লাত্মক ঘোষণা। এই দাওয়াতের বিরুদ্ধে সকল রাজা-বাদশা ও তাদের উচ্ছিষ্টভোগী আমলা, পুরোহিত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সবাই প্রচণ্ড বাধা প্রদান করেছে। শাসকবর্গ সবাই ছিল আল্লাহপাকের প্রতিদ্বন্দ্বী এক একজন তাগুত। আল্লাহপাকের আহবান ছিল তাগুতকে অস্বীকার করে কেবল তাঁকেই ইলাহ হিসেবে মেনে নেয়া এবং তাঁরই আনুগত্য করার। আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো’- সুরা নহল ৩৬। তাগুতকে অস্বীকার করে কেবল আল্লাহকে মেনে চলা তখনই সম্ভব যখন জমিনে আল্লাহপাক প্রদত্ত দীন কায়েম থাকে।
আল্লাহপাক সর্বশেষ নবী ও রসূল মুহাম্মদ (সা.) -এর জন্য এক পূর্ণাঙ্গ দীন (জীবনব্যবস্থা) হিসেবে ইসলামকে (নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হলো ইসলাম- আলে ইমরান ১৯) মনোনীত করেছেন এবং আল্লাহপাকের দাবি তাঁর বান্দারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম মেনে চলবে। তাঁর বাণী, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন’- সূরা বাকারা ২০৮।
পুরোপুরি ইসলাম মানা তখনই সম্ভব যখন আল্লাহর জমিনে তাঁর দীন প্রতিষ্ঠিত থাকে। সকল নবী-রসূলের জীবনের মিশন ছিল জমিনে আল্লাহর দীন কায়েম করা এবং এই একটি উদ্দেশ্যেই আল্লাহপাক এতো নবী-রসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেসব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নুহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মদ) যা এখন আমি তোমার কাছে ওহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মুসা ও ইসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, দীন কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি করো না’- সুরা শুরা ১৩। দীন কায়েমের প্রশ্নে কোনো মতপার্থক্য আল্লাহপাক মেনে নেবেন না। দীন কায়েমের পন্থা-প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে কিন্তু দীন কায়েমের প্রচেষ্টা থেকে গাফেল থাকার কোনো সুযোগ নেই। সর্বশেষ নবী ও রসুল মুহাম্মদ সা.- কেও একই দায়িত্ব অর্থাৎ দীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যেই পাঠানো হয়েছে এবং রসুল সা.-এর সকল কর্ম-প্রচেষ্টা ছিল দীন কায়েমের উদ্দেশ্যে। আল্লাহপাক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কুরআন মজিদের তিন জায়গায় সূরা তওবা (৩৩ নং), সূরা ফাতাহ্ (২৮ নং) ও সূরা সফে (৯ নং) উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর বাণী, ‘তিনি আপন রসূলকে হেদায়াত ও সত্য-সঠিক জীবনব্যবস্থা (দীনে হক) দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর একে বিজয়ী করে দিতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক’- সূরা সফ ৯।
দীন কায়েম কোনো একক ব্যক্তি বিশেষের কাজ নয় বা কারো পক্ষে সম্ভবও নয়, এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। পৃথিবীতে কোনকিছুই একক প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়নি। জমিনে যেসব মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে তার পেছনে আছে দলবদ্ধ শক্তি। আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’। আল্লাহপাক তাঁর পথে জিহাদকারীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাঁর বাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তাদেরই ভালোবাসেন যারা সীসাঢালা প্রাচীরের মতো জামাতবদ্ধভাবে লড়াই করে’- সূরা সফ ৪। আল্লাহর পথে জিহাদকারী বান্দাকে সুস্পষ্ট ক্ষমা ও জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে (সূরা সফ ১২।
আল্লাহর পথে জিহাদ করাকে দায়সারাভাবে নয় বরং হক আদায় করে করার জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে (সূরা হজ ৭৮)। কুরআন মজিদে নানাভাবে আল্লাহর পথে জিহাদের আহবান জানানো হয়েছে। জিহাদের প্রশ্নে আল্লাহপাক মুমিন, কাফের ও মুনাফিক চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সঙ্গী- সাথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’- সূরা নেসা ৭৬। এখানে পক্ষ দু’টি- মুমিন ও কাফের। মুমিন মাত্রই আল্লাহর পথে লড়াকু সৈনিক আর কাফের তার বিপরীত তাগুতের পথে প্রচেষ্টাকারী। মাঝামাঝি যদি কিছু থাকে তারা হলো, যারা তামাশা দেখতে চায় যে কে বিজয়ী হয়? এদেরকে মুনাফিক হিসেবে আল্লাহপাক উল্লেখ করেছেন। এ কথা স্পষ্ট যে, কোনো ঈমানদার ব্যক্তি দীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থেকে কখনই নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখতে পারে না। দীন প্রতিষ্ঠার তাগিদে জামাতবদ্ধ জিন্দেগি যাপনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে এবং মুসলমান হওয়াটা নির্ভর করে জামাতবদ্ধ জীবন যাপনের উপর। তাঁর বাণী, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো ভয় করার মতো এবং মুসলমান না হয়ে মরো না। তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না- সূরা আলে ইমরান ১০২-১০৩।
কুরআনের পাশাপাশি হাদিসেও মুসলমান হওয়ার জন্য জামাতবদ্ধ জীবন যাপনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। হজরত হারেস আল আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের পাঁচটি কাজের আদেশ করছি (অন্য রেওয়াতে আছে, আমার আল্লাহ আমাকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন) (১) জামাতবদ্ধ হবে (২) নেতার আদেশ মন দিয়ে শুনবে (৩) নেতার আদেশ মেনে চলবে (৪) আল্লাহর পথে হিজরত করবে (আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ বর্জন করবে) (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। আর তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি সংগঠন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলবে, তবে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। আর যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে লোকদের আহবান জানাবে সে জাহান্নামে যাবে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল (সা.), সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন করা সত্ত্বেও? আল্লাহর রসূল (সা.) বললেন, সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন এবং নিজেকে মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও’ -আহমদ ও তিরমিজি। তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াতের উপর রয়েছে আল্লাহর রহমত। যে ব্যক্তি জামাত ছাড়া একা চলে, সে তো একাকী দোযখের পথেই ধাবিত হয়’- তিরমিজি। রসূলুল্লাহ (সা.) বড়ো শক্ত কথা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আনুগত্য পরিত্যাগ করে এবং জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু’ - মুসলিম।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মুসলমান হওয়ার জন্য সবাই মিলে কি একটি দল হতে হবে? জবাবে বলবো, না। রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে একাধিক দলের কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ রসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য শর্তহীনভাবে ফরজ ছিল। দীন কায়েমের প্রক্রিয়া ও উপায় নিয়ে ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। ফলে একাধিক দল বা সংগঠন থাকতেই পারে। তবে দলসমূহের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ থাকা স্বাভাবিক নয় বরং যারা হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হবে তাদের সম্পর্কে আল্লাহপাকের কঠোর হুশিয়ারী রয়েছে। আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা যেন তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য হেদায়াত পাওয়ার পরও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে। যারা এ নীতি অবলম্বন করেছে তারা সেদিন কঠিন শাস্তি পাবে। যেদিন কিছু লোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং কিছু লোকের মুখ কালো হয়ে যাবে। তাদেরকে বলা হবে, ঈমানের নেয়ামত লাভ করার পরও তোমরা কুফরি নীতি অবলম্বন করলে? ঠিক আছে, তাহলে এখন এ নেয়ামত অস্বীকৃতির বিনিময়ে আজাবের স্বাদ গ্রহণ করো। আর যাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা আল্লাহর রহমতের আশ্রয় লাভ করবে এবং চিরকাল তারা এ অবস্থায় থাকবে’- আলে ইমরান ১০৫-১০৭।
একামতে দীনের চেতনা না থাকার কারণে আমরা দীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলেছি এবং আংশিক দীন পালনের মধ্যে আখেরাতের নাজাত তালাশ করছি। বেনামাজি, ঘুষখোর, সুদখোর, অনর্গল মিথ্যা রচনাকারী, খেয়ানতকারী, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী নিরেট মুনাফিক ও পর্দার মতো ফরজ বিধান লঙ্ঘনকারী নারী-পুরুষ সবাই আশা করে যে তারাও জান্নাতে যাবে। অথচ আল্লাহপাকের দাবি আংশিক নয় পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়ার। তাঁর বাণী, ‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’- সূরা বাকারা ৮৫। হ্যাঁ, আমরা বিশ্বব্যাপী এখন মান-সম্মান নিয়ে নয় বরং জিল্লতির জীবন যাপন করছি। আল্লাহপাক আমাদেরকে শ্রেষ্ঠতম জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বাণী, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠতম জাতি, তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য, তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে’- সূরা আলে ইমরান ১১০। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব যাদের হাতে মূলত মান-সম্মান সব তাদেরই এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা তাদের পক্ষেই সম্ভব। আল্লাহপাক শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ডের নেতৃত্বে ঈমানদারদেরকে দেখতে চান না বরং বিশ্বনেতৃত্বে মুসলমানদের সমাসীন দেখতে চান যাতে সকল অনাচার দূর করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
আমাদের মাঝে এক বিরাট জনগোষ্ঠী মনে মনে প্রশান্তি খুঁজে যে তারা রাজনীতি করে না। অথচ সকল নবি-রসুলের সাথে শাসকগোষ্ঠীর শত্রুতার মূলে ছিল রাজনীতি। শাসকগোষ্ঠী স্পষ্ট বলেছে, নবী-রসূল দাবিদাররা তাদের সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন করে দিতে চায় অর্থাৎ সমাজের নেতৃত্ব থেকে তাদেরকে উৎখাত করতে চায়। মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যাওয়ার প্রাক্কালে আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাঁর নবিকে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তোমার পক্ষ থেকে একটি কর্তৃত্বশীল পরাক্রান্ত শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও (সুলতানান নাসিরাহ)’- সুরা বনি ইসরাইল ৮০। সমাজে যতো অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন সবকিছুর মূলে রয়েছে অসৎ নেতৃত্ব এবং রসুলের আগমন ছিল অসৎ নেতৃত্ব দূর করে সেখানে সৎ নেতৃত্ব কায়েম করা। একটি সমাজে তখনই সুবিচার কায়েম করা সম্ভব যখন সেই সমাজে আল্লাহর আইনের পাশাপাশি সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।
দলবদ্ধ জীবন যাপনের হাতে-কলমে অনুশীলন হলো জামাতে নামাজ। ঈমান আনার পরে একজন ব্যক্তির প্রথম দায়িত্ব হয় নামাজের জামাতে হাজির হওয়া। আল্লাহপাক নামাজ জামাতের সাথেই ফরজ করেছেন। ওজর ছাড়া একাকী নামাজের কোনো সুযোগ নেই। রসূলুল্লাহ (সা.) একজন অন্ধ সাহাবিকেও একাকী নামাজ আদায়ের অনুমতি দেননি। জামাতে নামাজ আদায় করলে ইমামের অধীন মুসল্লিদের নামাজে কোনো ভুল নেই; ভুল হবে তখনই যখন ইমামের আনুগত্যের ক্ষেত্রে ত্রুটি হয়। ইমামের আনুগত্যের একটি সীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ইমাম ফরজ লঙ্ঘন করলে নামাজ পুনরায় আদায় করতে হয়; ওয়াজিব ভুল করলে সহু সেজদা দিতে হয় এবং এর নিচে সুন্নাত- মুস্তাহাবের ভুল বিবেচনা যোগ্য নয়। দৈনিক পাঁচবার জামাতবদ্ধভাবে নামাজ এবং নেতার (ইমাম) আনুগত্যের জীবনব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রত্যেক মুসলমান নিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের কোনো চেতনা নেই। না আছে নিজেদের মাঝে কোনো ভ্রাতৃত্ববোধ, আর না আছে ইমামকে মেনে চলার কোনো অনুভূতি, আর না আছে সমাজ থেকে অন্যায় দূর করার কোনো পরিকল্পনা। অথচ মহল্লায় কয়েকজন যুবক সপ্তাহে একদিন একত্রিত হলে মানুষ তাদের সমীহ করে চলে। বলাবলি হয়, ঐ যুবকগুলো সংঘবদ্ধ, ওদের একজন লিডার আছে এবং প্রতি সপ্তাহে ওরা একত্রিত হয়। আর আমরা আল্লাহর ঘরে প্রতিদিন পাঁচবার মিলিত হই এবং আমাদের নেতার (ইমামের) আনুগত্যের একটি মহড়া দেই। সাথে সাথে নেতা আমাদের কাছ থেকে মহান আল্লাহপাকের গোলামি (ইবাদত) করার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। ইমাম সাহেবের সূরা ফাতেহা পাঠ শেষে আমরা মুসল্লিরা সমস্বরে বলে উঠি ‘আমিন’। অথচ মসজিদ থেকে বের হয়েই প্রতিশ্রুতি ভুলে আমরা দাসত্ব করি নিজের নফস, আল্লাহ ছাড়া দেয়া অন্য কোনো নিয়ম বা সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের।
সমাজে হাজারো অন্যায়-অবিচার, জুলুম- নির্যাতন ও অশান্তির মূলে রয়েছে অসৎ, খোদাবিমুখ ও দুষ্টু প্রকৃতির লোকের কর্তৃত্ব। দীন কায়েমের অর্থ হলো আল্লাহপাক প্রদত্ত আইন ও সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। রসূলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ তেরোটি বছর মক্কায় নিরলসভাবে মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর ও তাঁর সাহাবিদের মক্কায় অবস্থানে সমাজের পাপাচার ও জুলুম-নির্যাতন দূর হয়নি কারণ সে সময়ে মক্কার কর্তৃত্ব ছিল আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মতো দুর্বৃত্তদের হাতে। কিন্তু যেদিন বিজয়ীর বেশে মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করলেন সেদিন দূরীভূত হলো কাবা থেকে সমস্ত মূর্তি এবং সমাজ মুক্ত হলো সকল জুলুম-নির্যাতন ও পাপাচার থেকে। আল্লাহপাকের ঘোষণা, যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসলো তখন দেখলে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দীনের মধ্যে শামিল হচ্ছে (সূরা নসর)। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছাড়া কখনো কোনো আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় না ঠিক তেমনি ইসলামও তার অনুসারীদের কাছে দাবি করে সকল মতাদর্শের উপর তাকে বিজয়ী করার। দীনকে বিজয়ী করার প্রচেষ্টা কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয় প্রয়োজন দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। আল্লাহপাক মুসলিম উম্মাহকে উপলব্ধি দান করুন এবং সকল ভয়-ভীতি, দুর্বলতা ও দুনিয়াপ্রীতি উপেক্ষা করে জামাতবদ্ধ হয়ে প্রচেষ্টা চালনার তৌফিক দান করুন।