26/04/2026
সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সৃজনশীলতার সহায়ক না কি প্রতিবন্ধক?
বর্তমান নিউ মিডিয়ার যুগে অনেক সাংবাদিক বন্ধু টেলিভিশন বা পত্রিকার প্রতিবেদন সরাসরি এআই (AI) দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি সহজ মনে হলেও, এটি আসলে আমাদের পেশাগত অযোগ্যতারই একটি প্রতিফলন। প্রযুক্তির ওপর এই অতি-নির্ভরতা চলতে থাকলে একসময় আমরা আমাদের নিজস্ব মেধা ও মনন হারিয়ে ফেলব। আমরা যতই দক্ষ বা অভিজ্ঞ হই না কেন, এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো খবরের মৌলিক কাঠামো বা বুননশৈলীই আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এআই কখনো মানুষের বিকল্প হতে পারে না। একটি সার্থক প্রতিবেদনে পাঠক বা দর্শক সবসময় 'হিউম্যান টাচ' বা মানবিক প্রকাশভঙ্গি খুঁজে পেতে চায়, যা কেবল একজন মানুষের আবেগ ও বিচারবুদ্ধি দিয়েই সম্ভব। তাই সরাসরি রিপোর্ট লিখিয়ে না নিয়ে, আমরা এই প্ল্যাটফর্মকে আইডিয়া জেনারেট করা, তথ্যের উৎস খোঁজা কিংবা নতুন নতুন শব্দচয়ন শেখার কাজে ব্যবহার করতে পারি। এআই হোক আমাদের সহায়ক, আমাদের মেধার প্রতিস্থাপক নয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যখন একজন সাংবাদিক মাঠপর্যায়ে কোনো অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সংগ্রহ করেন, তখন সেখানে মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের যে আবহ থাকে, এআই তা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না। এআই হয়তো নির্ভুলভাবে তথ্য ও পরিসংখ্যান সাজিয়ে দেবে, কিন্তু সেই লেখনীতে মানুষের হদয়স্পন্দন বা আবেগ ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হবে। তাই যান্ত্রিক তথ্যের সাথে যখন একজন সাংবাদিক নিজের দেখা অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটান, তখনই সেই প্রতিবেদনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে।
এছাড়া, এআই-কে আমরা যদি কেবল আমাদের গবেষণার সহযোগী বা 'রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট' হিসেবে ব্যবহার করি, তবেই এটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। যেমন, কোনো একটি জটিল আইনি বিষয়ে রিপোর্ট করার সময় আমরা সংশ্লিষ্ট আইনের ধারাগুলো এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত খুঁজে নিতে পারি, কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ সাধারণ মানুষের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলছে, তার বিশ্লেষণ করতে হবে নিজের প্রজ্ঞা দিয়েই। প্রযুক্তি আমাদের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দক্ষতা ও নিজস্ব শব্দশৈলী আমাদেরই অর্জন করতে হবে, যাতে আমাদের সাংবাদিক সত্তা কোনো যন্ত্রের কাছে জিম্মি হয়ে না পড়ে।
একজন দক্ষ সাংবাদিক হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো নিয়মিত ভালো মানের পত্রিকা, বই এবং নামী অনলাইন পোর্টালের প্রতিবেদন পড়া কিংবা মানসম্মত টেলিভিশন রিপোর্ট দেখা। পড়ার অভ্যাস আমাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে এবং শব্দভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। যখন আমাদের ঝুলিভর্তি শব্দ থাকবে, তখন কোনো রিপোর্ট লিখতে গিয়ে আমাদের আর শব্দচয়নের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না, মেধাশক্তি ও সৃজনশীলতা থেকেই বেরিয়ে আসবে শক্তিশালী সব বাক্য।
পরিশেষে বলবো, প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগই আমাদের এগিয়ে নেবে। আমরা এআই-কে বর্জন না করে বরং একে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করতে শিখি, যাতে আমাদের পেশাদারিত্ব আরও শাণিত হয়। আসুন, আমরা যান্ত্রিক না হয়ে সৃজনশীল হই এবং নিজেদের মেধা দিয়ে সাংবাদিকতার মান বজায় রাখি।
লেখক: ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ