18/04/2026
শুরুটা দেখতে খুব সাধারণ। একটা ব্যস্ত কারখানা, সেলাই মেশিনের শব্দ, মাথা নিচু করে কাজ করা মানুষ। কিন্তু একটু তাকালেই বোঝা যায়, এখানে শুধু কাপড় না, ভবিষ্যৎ বানানো হচ্ছে।
গুজরাট আর বেঙ্গালুরুর কিছু বড় কারখানায় এখন নতুন নিয়ম। শ্রমিকদের মাথায় একটা সাদা ব্যান্ড, সামনে ছোট ক্যামেরা। তারা আগের মতোই কাজ করছে, কাপড় ভাঁজ করছে, সেলাই করছে, বোতাম লাগাচ্ছে। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, এখন তাদের প্রতিটা নড়াচড়া রেকর্ড হচ্ছে।
একজন নারী শ্রমিক খুব সাবধানে সুঁইয়ে সুতো ঢুকাচ্ছেন। তার আঙুল একবার হালকা কাঁপলো, তারপর ঠিক হলো। আরেকজন কাপড় ভাঁজ করতে গিয়ে চাপটা একটু কম দিলেন, পরে ঠিক করলেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ক্যামেরা ধরে ফেলছে। প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য ছবি, ভিডিও জমা হচ্ছে।
এই ডেটা পরে চলে যাচ্ছে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে। তারা এই ভিডিও বিশ্লেষণ করে রোবটকে শেখাচ্ছে, কিভাবে কাপড় ধরতে হয়, কতটা চাপ দিতে হয়, কোথায় ধীরে কাজ করতে হয়। নাম দেওয়া হয়েছে ইমিটেশন লার্নিং। সহজ কথা, মানুষ যা করছে, রোবট সেটাই শিখছে।
এখান পর্যন্ত গল্পটা পরিষ্কার। কিন্তু অস্বস্তিটা অন্য জায়গায়।
এই শ্রমিকরা জানে তারা কাজ করছে। কিন্তু তারা কি জানে, তারা আসলে নিজেদের বিকল্প বানাচ্ছে? যে দক্ষতা তারা বছরের পর বছর ধরে গড়েছে, সেটাই এখন ডেটা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ডেটার মালিক তারা না, দামটাও তারা ঠিক করে না।
আরেকটা বিষয় এখানে চুপচাপ কাজ করছে। এই রোবটগুলো আজই তাদের জায়গা নেবে না। এগুলো তৈরি হচ্ছে এমন দেশগুলোর জন্য, যেখানে শ্রমের দাম অনেক বেশি। ইউরোপ, আমেরিকা বা উন্নত শিল্পাঞ্চলে একই কাজ করাতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। সেখানে এই রোবট ব্যবহার করলে খরচ কমবে, কাজ চলবে বিরতি ছাড়া। অর্থাৎ, এই কারখানার শ্রমিকের হাতের কাজ একদিন অন্য দেশে গিয়ে মেশিনের মাধ্যমে চলবে।
সমস্যাটা এখানেই। যে মানুষটা এই দক্ষতা তৈরি করছে, সে হয়তো জানেই না তার কাজের আসল ব্যবহার কোথায় হবে। সে ভাবছে সে শুধু নিজের কাজটাই করছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিটি নড়াচড়া জমা হচ্ছে এমন এক সিস্টেমে, যেটা ভবিষ্যতে মানুষকে কম প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখেন, এই কাজের জন্য তাদের বাড়তি কিছুই দেওয়া হচ্ছে না। একই সময়, একই মজুরি, কিন্তু কাজের ভেতরে ঢুকে গেছে আরেকটা স্তর, যেখানে তারা অজান্তেই শিক্ষক হয়ে গেছে।
প্রযুক্তি বলবে, এটা উন্নতি। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যখানে।
যে মানুষটা আজ নিজের হাত দিয়ে রোবটকে নিখুঁত কাজ শেখাচ্ছে, সে কি সত্যিই ভবিষ্যতের অংশ, নাকি খুব শান্তভাবে নিজের জায়গাটা ছেড়ে দেওয়ার ট্রেনিং নিচ্ছে?