28/04/2026
Afsar Brothers থেকে প্রকাশিত Sober- এর “লয় ভাগছে” বইটি অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। মূলত সোবারের হিউমারাস পোস্টের আমি ভীষণ ভক্ত, সেই তাগিদেই বইটি নেওয়া।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, স্মার্টফোন আমাদের ধৈর্য অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আঙুলের ডগায় একের পর এক রিলস দেখতে দেখতে বই পড়ার ধৈর্য যখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে, তখন সোবারের “লয় ভাগছে” বইটি টানটান উত্তেজনা আর ভয়ের মধ্যে আমাকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটকে রেখেছে। অনেক দিন পর একটানে পুরো একটা বই শেষ করে একটু আফসোসই হচ্ছিল—যদি আরো কটা গল্প থাকতো!
প্রথম গল্প “অতিথি”, তারপর “চাচা কাহিনি”, “তাবিজ”, “আম্মু”—এই চারটি গল্পের সঙ্গে আমার জীবনের কিছু ঘটনার অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছি বলেই এই লেখা। আজকের গল্পটা “তাবিজ” গল্পের ছায়া অবলম্বনে আমার নিজের জীবনের একটি ঘটনা শেয়ার করতেছি।
আমি তখন ব্যাচেলরে পড়ি, ফাইনাল ইয়ার। থাকতাম বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি ব্লকে (রোড বা বাসা নম্বর উল্লেখ করছি না)। চার বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটে আমরা চারজন ছাত্রী থাকতাম। পুরো বিল্ডিংয়ে আমরা ছাড়া বাকিরা সবাই ফ্যামিলি। বাড়িওয়ালা আঙ্কেলও বেশ ভদ্রলোক ছিলেন, তাই সব মিলিয়ে বাসাটা আমাদের কাছে নিরাপদই মনে হয়েছিল।
আমাদের একজনের বাসা একটু দূরে হওয়ায় সে শুধু পরীক্ষার সময় কিংবা মাসে এক দুইদিন এসে থাকত, বাকি সময় আমরা তিনজনই থাকতাম। আমার অভ্যাস ছিল মাগরিবের আজানের আগেই বাসায় ফেরা। অন্য দু’জন ক্লাস শেষে ৩০০ ফিটে আড্ডা দিয়ে রাত ৯-১০টার দিকে ফিরত। তখন (২০১৫/১৬ সালের দিকে) ৩০০ ফিট মানেই ছিল স্টুডেন্টদের জমজমাট আড্ডার জায়গা।
বাসায় একা থাকলে প্রায়ই মনে হতো, আমি একা নই—আরও কেউ আছে। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, যেন কেউ হাঁটাচলা করছে। আমি রুম থেকে বের হলেই মনে হতো কেউ দৌড়ে সামনের রুমে ঢুকে যাচ্ছে (যে ফ্ল্যাটমেট মাঝে মাঝে থাকত, তার রুম)। ছোটবেলা থেকেই কিছু প্যারানরমাল অভিজ্ঞতা থাকায় ব্যাপারগুলো পুরোপুরি অচেনা ছিল না, তবুও অস্বস্তি বাড়ছিল। তবে সবাই একসাথে থাকলে সব স্বাভাবিক থাকত।
একদিন মাঝরাতে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে যায়। পানি খেতে ডাইনিংয়ে যাওয়ার জন্য দরজা খুলতেই দেখি—একটা ছোট মেয়ে! বছর চারেক হবে বয়স। গোলাপি ফ্রক পরা। প্রথমে মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু হুঁশ ফিরতেই গলা দিয়ে শুধু গোঙানির মতো শব্দ বের হচ্ছিল। চিৎকার করে কাউকে ডাকব—সেই শক্তি বা বোধ, কোনোটাই কাজ করছিল না।
পরদিন পাশের রুমে থাকা আমার বান্ধবীকে সব বললাম। সে শুনে বলল, “তোর সাথে কিছু আছে বলেই তুই এসব দেখছিস। আমাদের এসব বলিস না।” অনেক কষ্টে ভালো একটা বাসা পেয়েছি—এটা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না, ঠিকমতো নামাজ দোয়া পড়।কথাগুলো শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম। কারণ আগের বাসাটাও কিছু ঘটনার কারণে আমার জোরাজুরিতেই ছেড়েছিলাম।
এরপর থেকে মাঝেমধ্যে সেই গোলাপি ফ্রক পরা মেয়েটাকে দেখতে শুরু করলাম, বেশিরভাগই গভীর রাতে। দিনের বেলা কখনো না।
সেমিস্টার ফাইনালের পর আমার বান্ধবী বাসায় চলে যায়। আমার ইন্টার্নশিপ খোঁজা আর একটি কোর্সের ফাইনাল বাকি থাকায় আমি থেকে যাই। সাথে ছিল অন্যরুমে থাকা জুনিয়র এক মেয়ে—ধরি তার নাম সায়মা। তাকে আমি এসব কিছু বলিনি।
প্রায় প্রতিদিনই রাত ৯-১০টা পর্যন্ত বাসায় একা থাকতাম। আর রাত হলেই শুরু হতো অদ্ভুত সব ঘটনা—কখনো দেখি বাচ্চা মেয়েটা রুম থেকে ব্যালকনির দিকে যাচ্ছে। দিন দিন মানসিক অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কোনোভাবে পরীক্ষা শেষ করে বাসায় চলে যাই। এসবকিছু আব্বা আম্মাকে বলতেও ইচ্ছা করছিলো না। আব্বা আম্মা জানলে আম্মা চলে আসবে আমার কাছে, আমার অন্যান্য ছোট ভাইবোনরা অসুবিধায় পরে যাবে, সবকিছু মিলায় মনে হচ্ছিলো কোনরকমে পরীক্ষাটা শেষ করতে পারলেই হলো, মাত্র কটা দিনেরই তো ব্যাপার। এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যা ৭-৮ টার দিকে গোসল করে বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি রুম থেকে একটা ছায়ার মতোন কিছু ব্যালকনিতে চলে যাচ্ছে (আমার রুমের সাথে এটাচড ব্যালকনি)। কোনরকমে জামা কাপড় গায়ে দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। সেদিন আমার জুনিয়র সায়মা গেছিলো নিউমার্কেটে, ফিরতে দেরি হচ্ছে, জ্যামে আটকা পড়ে আছে। সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি বসুন্ধরা গেইটে পপাইস এ বসে ছিলাম।
সেই রাতে বাসায় ফিরার পরে আমার উতাল পাতাল জ্বর এলো। জ্বরের ঘোরে অদ্ভুত সব হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল—কখনো মনে হচ্ছিল বিশাল মাঠে শুয়ে আছি, কখনো মনে হচ্ছিল অনেক মানুষ আমাকে ঘিরে বসে আছে। আমি নাকি প্রলাপ বকছিলাম—পরে সায়মার মুখে শুনেছি।
জ্বর বেশি দেখে সায়মা মাথায় পানি দেয়, জলপট্টি দেয়। এরপর আমি গভীর ঘুমে চলে যাই। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে মনে হলো—আমার বালিশটা চেক করা উচিত। এটা ঠিক বোঝাতে পারছি না—মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ জেগে উঠে বালিশের কাভার খুললাম। অনেকক্ষণ ধরে চেপে চেপে দেখার পর বুঝলাম, ভেতরে শক্ত কিছু আছে। ড্রয়ার থেকে কাঁচি এনে বালিশ কেটে দেখি—ভেতরে একটা তাবিজ! ছোট ধাতব চারকোনা তাবিজ।
তাবিজটা হাতে নেওয়ার পর অদ্ভুতভাবে শরীর হালকা লাগছিল। অথচ বালিশটা আমি নিজেই নতুন বাজারের একটি দোকান থেকে কিনেছিলাম। এতদিন ব্যবহার করেও কখনো বুঝিনি ভেতরে কিছু আছে! কোন দোকানদারই বা ভেতরে তাবিজ দিয়ে তারপর সেলাই করে কেনো বালিশ বিক্রি করবে!
পরদিনই দারোয়ান মামাকে দিয়ে তাবিজটা অন্য কাগজের সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলি। আর সেদিনই ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে বাসায় চলে যাই। পরে অবশ্য কোর্সটি রিটেক নিতে হয়েছিল।
মজার ব্যাপার হলো—সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই বাচ্চা মেয়েটাকে আর কখনো দেখিনি।
এমন আরও অনেক ঘটনা আছে, এটি তার মধ্যে একটি। তাবিজ ঘটনার রেশটা বছরখানেক আগে আবারো জীবনে ফিরে এসেছিল—সেটা অন্য কোনো সময় বলব।
ফুটনোটঃ আমি আগে কখনো গল্প লিখিনি, এমনকি ফেসবুকে এত বড় পোস্টও দিইনি। ভাষাগত ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন😇