29/11/2025
**উপন্যাস: স্বপ্নদাহ
চতুর্থ অধ্যায়
প্রায় মাস খানেক পরে একদিন সৌরভ তার ঘরে পড়তে বসেছে। বিকাল বেলা সমস্ত বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। সকল মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করার পর ক্লান্ত দেহে ঘরে ফেরা শুরু করেছে। পাখিরও কলরব থেমে গেছে। মসজিদে মুয়াজ্জিনের আযান দেওয়া শেষ হয়েছে। চারদিকে রাতের কালো আভা ছড়িয়ে পড়ছে।
সৌরভ ঘরের ভেতরে পড়েই যাচ্ছে—কারণ সামনে তার বার্ষিক পরীক্ষা। পড়ার চাপের কারণে পুরো বিকাল ঘরের ভিতরে কাটাতে হলো তাকে। বাহিরে আসার সময়টুকুও সে পায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত্রির কালো ছায়া সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো ।
এর মধ্যে কলি ও তার বান্ধবী রাশিদা এসে হাজির। কলিকে দেখে সৌরভ স্তম্ভিত হয়ে গেল। কলিও রাশিদাকে নিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রদীপের আলোয় কলির মুখে যেন সোনালি রঙের ছটা পড়েছে—চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা।
কলি দু’কদম সরে জানালার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলো। ফিসফিস করে রাশিদাকে কিছু বলল, কিন্তু কথাটা বোঝার উপায় ছিল না। খানিক পরে রাশিদা সৌরভের ঘরে প্রবেশ করল—দরজা খোলা ছিল বলে নক করার প্রয়োজন হলো না।
রাশিদাকে দেখে সৌরভ একটু অপ্রস্তুত স্বরে বলল,
— “কিরে রাশিদা, কেমন আছিস?”
— “ভালো, আপনি কেমন আছেন সৌরভ ভাই?”
— “ভালো তো… কিন্তু এই আগমন? কিছু বলবি?”
রাশিদা হেসে উঠল—হাসিটা যেন একটু ব্যঙ্গাত্মক, আবার মিশে আছে কিশোরী দুষ্টামি।
— “আপনি তো বই পড়তে গা ঢাকা দিয়েছেন! প্রেমের আবার সময়-অসময় আছে নাকি ভাই? নদীর স্রোত যেমন চলতেই থাকে, প্রেমের স্রোতও তেমনি অস্থির, চির বহমান।”
তারপর সে নিজের মত করেই বলতে লাগল,
— “সাগর-নদীর মিলন না হলে জোয়ার আসে? নদীর জল সাগরে মিশে যে কতো শত প্রেমের গল্প রচনা করে—সে তো চিরন্তন। সেই টানে আজ কলি এসেছে। বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে—আপনার সাথে কিছু না বলা কথা বলবে।”
এক মুহূর্ত দেরি করল না সৌরভ। সে দ্রুত বাইরে এসে কলির সামনে দাঁড়াল।
সন্ধ্যার আলো নিভে গিয়ে চারদিকে ম্লান চাঁদের মায়া। দু’জনে কাছে আসতেই এক ধরনের নীরব উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। সৌরভ কলিকে নিয়ে বাড়ির আঙিনার পুরাতন আমগাছটির নিচে এসে দাঁড়ালো।
কলি চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টির সঙ্গে সৌরভের চোখ আটকে গেল। মুহূর্ত দু’এক সে যেন শ্বাস নিলেও তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ কলির চোখ নিচের দিকে নেমে গেল—লজ্জার ঢেউ গাল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল। দু’জনেই কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।
শেষ পর্যন্ত সৌরভ স্বাভাবিক হতে না পেরে বলল,
— “কলি… এতদিন কোথায় ছিলে? তোমাকে না দেখলে মনটা কেন যেন অস্থির হয়ে যায়।”
কলি ধীরে বলল,
— “অস্থির হলে আমার কী করার আছে? আপনি তো নাকি এখন শুধু বই-খাতা নিয়েই ব্যস্ত।”
— “তোমার কথা তো বইয়ের পাতাতেও কোথাও লেখা নেই… তবুও সারাদিন মনে পড়ে।”
কলির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
— “তাই নাকি? মনে পড়লে খোঁজ নেন না কেন?”
— “শক্তি পাই না… তোমার সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়, কিছু বলব—তবুও বলতে পারি না।”
কলি এবার একটু এগিয়ে এল। বাতাসে তার চুল ছড়িয়ে পড়ছে।
— “আজ বলুন… আজ তো এসেছি শুনতে।”
সৌরভের হৃদস্পন্দন যেন কানে শুনতে পাচ্ছিল। কথা জড়িয়ে গেল।
সে কিছু বলতে না পেরে হঠাৎই কলির হাত ছুঁয়ে ফেলল। তারপর ধীরে কাছে এলো। মুখ বাড়িয়ে চুম্বন করতে চাইলো।
কিন্তু কলি মৃদু শক্তিতে তার বাহু নিচে নামিয়ে দিল।
— “এভাবে নয় সৌরভ… প্রেম মানে শুধু স্পর্শ নয়। প্রেম মানে মনের কথা মনের কাছে তুলে ধরা।”
সৌরভ লজ্জায় মাথা নিচু করল,
— “ক্ষমা করো… আমি ভেবেছিলাম… তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না।”
কলি বলল,
— “আমি জানি। আপনি ভাবতে পারেন বলেই আজ এসেছি। কিন্তু প্রতিটি প্রেমের পথই সহজ নয়। আপনাকে যদি আমি মনে রাখি—আপনিও তবে আমাকে সম্মান দিয়ে রাখবেন… ঠিক তো?”
— “প্রতিশ্রুতি দিলাম, কলি।”
একটু নীরবতা। তারপর হঠাৎ কলি বলল,
— “জানো, আমি আজকেই ঠিক করেছি—তোমার কাছে আমার মন খুলে বলব।”
সৌরভ চমকে উঠল,
— “কি কথা?”
কলি ধীরে বলল,
— “হৃদয় যখন কারো দিকে ছুটে যায়, তখন যতোই লুকাতে চাও—লুকানো যায় না সৌরভ। তুমি… তুমি আমার সব চিন্তা-ভাবনার ভেতরে ঢুকে পড়েছো। তুমি না থাকলে আমার দিনগুলো কেমন যেন ফাঁকা মনে হয়।”
সৌরভের বুক ভরে উঠল।
— “তুমি সত্যি?”
— “হ্যাঁ। সত্যি।”
তারপর কলি খুব ধীরে বলল,
— “তবে একটা কথা… তোমার পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাকে আর দেখবে না। পড়াশোনাটা আগে শেষ করো। প্রেম অপেক্ষা করতে পারে—কিন্তু ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে না।”
সৌরভ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
— “তুমি চাইছো আমি দূরে থাকি?”
— “না… আমি চাই তুমি জিতো। তুমি সফল হলে তবেই আমাদের গল্পটা সুন্দর হবে।”
সৌরভ হাসল—মনে হলো রাতের সব অন্ধকার সরে আলো ফুটে উঠেছে।
— “তাহলে তুমি থেকো… আমার সাফল্যের পেছনে নীরব প্রেরণা হয়ে।”
কলি মাথা নাড়ল,
— “থাকব। তবে কথা দাও, পড়াশোনায় মন দেবে।”
— “কথা দিলাম। তুমি তো আমার আলো।”
দু’জনের চোখ আবার এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হলো।
বাতাস নিঃশব্দে বয়ে গেল। গাছের পাতার মধ্য দিয়ে চাঁদের আলো নেমে এসে দু’জনকে যেন আলতো আশীর্বাদ দিল।
কলি ধীরে বলল,
— “এখন যাই। আজ এতটুকুই।”
— “আবার কবে দেখা হবে?”
কলি পিছনে না তাকিয়ে শুধু বলল,
— “যখন তুমি প্রস্তুত হবে… শুধু প্রেমের নয়, জীবনের পথের জন্যও।”
সৌরভ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
কলি দূরে অন্ধকারের ভেতর মিশে যেতে যেতে মনে হলো—এই রাতের নীরবতাও যেন তাদের প্রেম স্বাক্ষর করে রাখল।
প্রেম দুইটি মেরুর আকর্ষণের বল—
দূরত্ব যত-ই থাকুক, একসময় মিলন অনিবার্য।
সেই মিলনের অপেক্ষায় রেখে যায় এই রাত, এই নীরব চাঁদ, আর দু’টি কিশোর হৃদয়।