28/09/2026
মানুষ তার জীবনের দরজাগুলোকে নিজের চোখের মাপে বিচার করে; যে দরজা খুলে যায় তাকে রহমত বলে, আর যে দরজা বন্ধ থাকে তাকে দুর্ভাগ্য মনে করে। অথচ সুফির দৃষ্টি বাহ্যিক দরজায় থেমে থাকে না—সে দরজার ওপাশে কী আছে, তার চেয়েও বেশি দেখে সেই সত্তাকে, যিনি দরজা খুলছেন কিংবা বন্ধ করছেন। কারণ তাসাউফের প্রথম শিক্ষা হলো—ঘটনার ওপর নয়, ঘটনার মালিকের ওপর হৃদয় স্থাপন করা।
তুমি যে দরজাটি বন্ধ দেখে অভিশাপ দাও, হয়তো সেই দরজার ওপাশেই তোমার ধ্বংস অপেক্ষা করছিল। তুমি যে মানুষটিকে হারিয়ে রাতভর কেঁদেছ, হয়তো তার বিচ্ছেদেই তোমার আত্মার কোনো অদৃশ্য উদ্ধার লেখা ছিল। তুমি যে প্রত্যাখ্যানকে অপমান ভেবেছ, হয়তো সেটিই ছিল তোমার রবের পক্ষ থেকে এক নীরব পাহারা। রহমত সবসময় ফুলের সুগন্ধ নিয়ে আসে না; কখনো কখনো সে আসে বিচ্ছেদের ধূলি মেখে, কখনো আসে ব্যর্থতার পোশাকে, কখনো আসে এমন একটি ‘না’ হয়ে—যার অর্থ তুমি বহু বছর পর বুঝতে পারো।
সুফি জানে, মানুষের ইচ্ছা সীমিত; কিন্তু আল্লাহর হিকমাহ সীমাহীন। মানুষ চায়—‘এটাই হোক’; আর তাওয়াক্কুলের মানুষ বলে—‘হে রব, তুমি যা চাও, তাতেই আমার অজ্ঞাত কল্যাণ রেখো।’ এই আত্মসমর্পণ পরাজয় নয়; এ হলো নফসের সিংহাসন থেকে নেমে রবের হুকুমের সামনে হৃদয়ের নত হওয়া। তাসাউফ মানুষকে পৃথিবী থেকে পালাতে শেখায় না; বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেও হৃদয়কে পৃথিবীর দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে শেখায়।
যে হৃদয় তাওহিদের স্বাদ পেয়েছে, সে জানে—দাতা একজন, রক্ষক একজন, পরীক্ষক একজন, আর প্রত্যাবর্তনও একজনের কাছেই। তাই সুফির কান্নাতেও অভিযোগ কমে আসে, আর মুনাজাতে জন্ম নেয় রিযা। সে বলে না, ‘আমার সঙ্গে এমন হলো কেন?’ বরং ধীরে ধীরে শেখে বলতে—‘আমি বুঝিনি, কিন্তু তুমি জানো।’ এই ‘তুমি জানো’ বাক্যটির মধ্যেই কখনো কখনো বছরের অস্থিরতা নিঃশেষ হয়ে যায়।
সাবর হলো কেবল কষ্ট সহ্য করা নয়; সাবর হলো কষ্টের মধ্যেও আল্লাহ সম্পর্কে সুন্দর ধারণা অটুট রাখা। আর রিযা হলো এমন এক অন্তর্গত প্রশান্তি, যেখানে বান্দা বুঝতে শেখে—সব পাওয়া রহমত নয়, সব হারানোও ক্ষতি নয়। কখনো প্রাপ্তি মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, আবার কখনো বঞ্চনাই তাকে সিজদার কাছে ফিরিয়ে আনে।
সুফির পথ নফসকে বড় করা নয়, নফসকে চিনে তার অহংকার ক্ষয় করা। সে নিজের ‘আমি’কে যত ক্ষুদ্র করে, ততই রবের মহত্ত্ব তার অন্তরে প্রকাশিত হয়। এই আত্মশুদ্ধির পথেই আসে ফানা—নিজের অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও মিথ্যা দাবির বিলয়; তারপর আসে বাকা—আল্লাহর আনুগত্য, প্রেম ও স্মরণে নতুন এক অস্তিত্বের বোধ।
তাই জীবনে কোনো দরজা বন্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ দিও না। কিছু দরজা বন্ধ থাকে তোমাকে বঞ্চিত করার জন্য নয়—তোমাকে রক্ষা করার জন্য। কিছু মানুষ চলে যায় তোমাকে একা করার জন্য নয়—তোমাকে তোমার রবের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছু স্বপ্ন ভেঙে যায় তোমার জীবন শেষ করার জন্য নয়—তোমার অন্তরের ভুল কিবলা সংশোধন করার জন্য।
যে রহস্য তুমি আজ অশ্রু দিয়ে পড়ছ, হয়তো কাল তা-ই শুকরিয়ার ভাষায় পড়বে।
কারণ আল্লাহর রহমত কখনো কখনো ‘হ্যাঁ’ হয়ে আসে, কখনো ‘অপেক্ষা করো’ হয়ে আসে, আর কখনো এমন এক ‘না’ হয়ে আসে—যার অন্তরে লুকিয়ে থাকে তোমার অদেখা নাজাত।
সুফি তাই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেবল দরজার দিকে তাকায় না; সে দরজার মালিকের দিকে ফিরে যায়।
কারণ তার বিশ্বাস—
যিনি দরজা বন্ধ করেছেন, তিনিই জানেন কোন দরজার ওপাশে আমার জন্য আলো, আর কোন দরজার ওপাশে আগুন।