23/05/2026
রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে উত্তেজনা
রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে উত্তেজনা
একটি নতুন নাম আবার। একটি নিষ্পাপ প্রাণের অকাল বিদায় আরেকবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানে ক্ষোভ, ঘৃণা ও কান্নার এক রোল উঠেছে। সাত বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসার নৃশংস হত্যা ও ধর্ষণ দেশের বিবেককে একবার আবার নির্মমভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। তবে এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালছে এক বুক হতাশা। কারণ, দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে, বিচার এখানে এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গ, যার শেষ প্রান্তে আলোর দেখা মেলা ভার।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর এখন নেট দুনিয়া উত্তাল হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ—সবাই একটাই দাবি জানাচ্ছে: “ধর্ষকের শাস্তি হোক প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড।” কিন্তু এই তীব্র প্রতিবাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম সত্য, যা সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে মাগুরার সেই ছোট্ট আছিয়ার কথা। যাকে হয়তো এখন সবাই ভুলে গেছে, যার মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলছে আপিলের লাল ফিতায়। রামিসার ক্ষেত্রেও কি তবে একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে? এই প্রশ্ন আজ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সকলকে।
নেট দুনিয়ায় ক্ষোভের দাবানল শুরু হয়েছে: ‘আমরা প্রকাশ্যে ফাঁসি চাই’—এমনটাই দেখাযায়। রামিসার ওপর নির্মম অত্যাচারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রামে যেন প্রতিবাদী মঞ্চে পরিণত হয়েছে। নেটিজেনদের দেওয়ালগুলোতে রামিসার হাসিমুখের ছবি এবং তার নিচে হাজারো মানুষের আকুতি ও ক্ষোভ প্রকাশ পিয়েছে। একজন নেটিজেন লিখেছেন, *“আমরা আর কোনো মোমবাতি মিছিল চাই না, আমরা আর কোনো গোলটেবিল বৈঠক চাই না। রামিসার খুনি ও ধর্ষককে জনসমক্ষে এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যেন আর কোনো অপরাধী কোনো শিশুর দিকে তাকানোর সাহস না পায়।”*
আরও পড়ুন: ঈদ উপলক্ষে ১০ দিনের জন্য বালুবাহী বাল্কহেড চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি
‘হ্যাশট্যাগ জাস্টিস ফর রামিসা’ এই হ্যাশট্যাগটি এখন ট্রেন্ডিংয়ে চলে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ অপরাধীর সর্বোচ্চ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। অনেকেই বলছেন, অপরাধীদের মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখার কোন মানে হয় না। একটি শিশুর অধিকার, তার বেঁচে থাকার অধিকার এভাবে খর্ব করা হলে, ধর্ষকের একমাত্র পাওনা হওয়া উচিত রাজপথে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড।
দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ও সাধারণ মানুষ ব্যানার-প্লেকার্ড হাতে রাজপথে নেমে এসেছেন। স্লোগান দিচ্ছেন, ‘ধর্ষকের আস্তানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘আমার বোন কবরে, ধর্ষক কেন বাইরে?’—এমন স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাজপথ। কিন্তু এই প্রতিবাদের ভেতরেও এক ধরনের ক্লান্তি এবং অবিশ্বাস ভর করেছে মানুষের মনে।
আছিয়াকে ভুলে গেছে সবাই: রামিসার ক্ষেত্রেও কি ভিন্ন কিছু না হওয়াটাই স্বাভাবিক? রামিসা হত্যাকাণ্ডের এই উত্তাল আবহে আজ থেকে এক বছর আগের মাগুরার সেই ছোট্ট আছিয়ার নির্মম স্মৃতি বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। আছিয়াকেও একইভাবে লম্পটদের বলি হতে হয়েছিল। তখনও দেশ কেঁদেছিল, তখনও রাজপথ গরম হয়েছিল, তখনও প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আজ আছিয়ার পরিবার কোথায়? বিচারপতিরা বদল হন, ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রত্যাশীদের কান্না থামে না। বাস্তবতা হলো, মাগুরার আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামিদের নিম্ন আদালতে সাজা হলেও, মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে আপিলের স্তরে এসে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। আইনি মারপ্যাঁচে অপরাধীরা হয়তো জেলের ভেতরে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে, অথবা জামিনের ফাঁকফোকর খুঁজছে। আর আছিয়ার মা-বাবা প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন জীবন্ত লাশের মতো। আছিয়াকে আজ সমাজ ভুলে গেছে, রাষ্ট্র ভুলে গেছে। সংবাদমাধ্যমের হেডলাইন থেকে সে বহু আগেই হারিয়ে গেছে।
আছিয়ার এই করুণ পরিণতি আজ রামিসার বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষকে সন্দিহান করে তুলেছে। সচেতন মহল ও নেটিজেনদের একাংশ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলছেন, “রামিসার ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু না হওয়াটাই তো এ দেশের স্বাভাবিক নিয়ম।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডে আজ হয়তো দেশ উত্তাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তারা দিচ্ছেন কড়া হুঁশিয়ারি। পুলিশ হয়তো দ্রুত চার্জশিটও দেবে। কিন্তু তারপর? তারপর শুরু হবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা। সাক্ষী না আসা, আইনজীবীদের সময়ের আবেদন, আর এক আদালত থেকে অন্য আদালতে মামলার ফাইল চালাচালি। ততদিনে হয়তো দেশ নতুন কোনো ঘটনার দিকে এগিয়ে যাবে, অন্য কোনো রামিসার লাশ পড়ে থাকবে কোনো ঝোপঝাড়ে বা ড্রেনে। আর এই রামিসার ফাইলটিও ধুলো জমবে আদালতের কোনো অন্ধকার কোণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর দীর্ঘসূত্রতাই অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে। আইনের শাসন যেখানে মন্থর, সেখানে অপরাধীদের উৎসব হওয়াটাই স্বাভাবিক। একটি সভ্য সমাজে সাত বছরের শিশুর রক্তাক্ত লাশ আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতীক। রামিসার মা-বাবার শূন্য কোল কোন আইনি সান্ত্বনা বা ক্ষতিপূরণে ভরবে না। দেশবাসী আজ শুধু একটি রায় চায় না, তারা চায় দ্রুত এবং দৃশ্যমান ন্যায়বিচার।
সচেতন মহলের দাবি, মাগুরার আছিয়ার মতো যেন রামিসার ফাইলটাও হারিয়ে না যায়। নেটিজেনদের ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডে’র দাবি হয়তো প্রচলিত আইনে অসম্ভব, কিন্তু এ দাবির পেছনের তীব্র আকুতি ও ক্ষোভকে রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। যদি এবারও রামিসার খুনি ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তি না হয়, তবে ধরে নিতে হবে—এই সমাজ ও রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে ধর্ষক আর খুনিদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। আমরা কি সত্যিই সেই অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? উত্তরটা রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে।